আফগানিস্তানে গভীর রাতে পাকিস্তানের বিমান হামলা
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদক:দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার ভঙ্গুর কূটনৈতিক সম্পর্ক এবার চূড়ান্ত সামরিক উত্তেজনার দিকে মোড় নিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দেশের মধ্যকার কৌশলগত সীমান্ত অঞ্চল তুলনামূলক শান্ত ও স্থিতিশীল থাকার পর মঙ্গলবার গভীর রাতে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে আচমকা এক প্রাণঘাতী বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে চালানো এই বিমান হামলায় ব্যাপক ঘরবাড়ি ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি শিশু ও নারীসহ অন্তত ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক আগ্রাসন।
আজ বুধবার (১০ জুন) বেলা ১১টা ৫৮ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও যুদ্ধ পরিস্থিতি’ এবং ‘দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতি, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা ট্র্যাকিং উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে আফগানিস্তানে পাকিস্তানি হামলার নেপথ্য কারণ ও সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরা হলো।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার গভীর রাতে আফগানিস্তানের সীমান্তঘেঁষা কৌশলগত তিন প্রদেশ—কুনার, খোস্ত এবং পাক্তিকায় একযোগে বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান। আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের প্রধান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই বর্বরোচিত হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ তাঁর পোস্টে অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পাকিস্তানের এই কাপুরুষোচিত বিমান হামলায় যারা নিহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ১১ জনই নিষ্পাপ শিশু, একজন অসহায় নারী এবং একজন বৃদ্ধ রয়েছেন। এছাড়া বোমার আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৪ জন নারী ও শিশু, যাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।” এই বিমান হামলাকে স্বাধীন আফগানিস্তানের ওপর সরাসরি আগ্রাসন এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এক ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি। তবে এই নজিরবিহীন হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় ইসলামাবাদের পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
হামলার সূত্রপাত ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইসলামাবাদ এর আগে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে চালানো বেশ কয়েকটি বিমান হামলার দায় স্বীকার করে দাবি করেছিল যে, তারা পাকিস্তানের মাটিতে নাশকতা চালানো নিষিদ্ধ ঘোষিত গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) সংশ্লিষ্ট যোদ্ধাদের গোপন আস্তানা লক্ষ্য করে এই অভিযান পরিচালনা করছে। মূলত, আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের হাসান খেল এলাকায় টিটিপি যোদ্ধারা পাকিস্তানের ফেডারেল কনস্ট্যাবুলারির (কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী) একটি নিরাপত্তা চৌকিতে অতর্কিত হামলা চালানোর ঠিক একদিন পরই এই পাল্টা বিমান হামলা চালাল পাকিস্তান। ওই চৌকির হামলায় তীব্র বন্দুকযুদ্ধে পাকিস্তানের ৬ জন আধাসামরিক সেনা নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের আগস্টে আশরাফ গনি সরকারকে হটিয়ে তালেবানরা দ্বিতীয়বারের মতো কাবুলের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চরম উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকেও বিমান হামলার জবাবে আফগানিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের ওপর পাল্টা গোলাবর্ষণ করলে দুই দেশের মধ্যে পুরোদমে লড়াই শুরু হয়েছিল।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান সরকার তাদের মাটিতে টিটিপি যোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয় ও অস্ত্র সরবরাহ করছে, যা ব্যবহার করে গোষ্ঠীটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরে একের পর এক আত্মঘাতী ও প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আফগানিস্তান শুরু থেকেই ইসলামাবাদের এই গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে আসছে। তালেবানদের দাবি, পাকিস্তান নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যর্থতা লুকাতে আফগানিস্তানের ওপর দোষ চাপাচ্ছে এবং ডুরান্ড লাইনের সার্বভৌমত্বকে কোনো সম্মান দেখাচ্ছে না।
এদিকে বিশ্বজুড়ে এই আন্তঃসীমান্ত সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। গত মে মাসে জাতিসংঘের প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই (জানুয়ারি-মার্চ) পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার আন্তঃসীমান্ত সশস্ত্র সংঘর্ষ ও গোলার আঘাতে অন্তত ৩৭২ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৩৯৭ জন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আঞ্চলিক সংঘাত দ্রুত নিরসন করা না গেলে তা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
জান্নাত সকালবেলা
|