ট্রাম্পের কাছে নেতানিয়াহুর প্রস্তাব: ইরান, সিরিয়া ও সৌদি পারমাণবিক চুক্তি
অনলাইন ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান শক্তি রোধে আরও কঠোর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ, সিরিয়ার কৌশলগত ভূখণ্ডে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং মার্কিন-সৌদি বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে নতুন রণকৌশল ও একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
হোয়াইট হাউসে দুই বিশ্বনেতার মধ্যকার প্রায় ৯০ মিনিটের রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে প্রকাশিত এক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস (Axios) এসব তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ইস্যুকে কেন্দ্র করে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে দৃশ্যমান মতপার্থক্য ও কূটনৈতিক উত্তেজনা চলছিল। তবে সেই টানাপোড়েন কাটানোর লক্ষ্যেই আয়োজিত এই বৈঠকটি শেষে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে সমগ্র আলোচনাকে অত্যন্ত ‘ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অন্যদিকে বৈঠক শেষে উৎফুল্ল নেতানিয়াহু ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এটিকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ‘অন্যতম সেরা আলোচনা’ বলে অভিহিত করে জানান, উভয় দেশই তেহরানকে কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক শক্তি অর্জন করতে না দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে একমত পোষণে অটল রয়েছে।
ইরান ইস্যুতে নতুন তিনটি পথ:
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে প্রকাশ, বৈঠকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে ইরান ও পারমাণবিক সংকট। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে স্পষ্ট ভাষায় জানান, তেহরানের বর্তমান নেতৃত্বের কূটনৈতিক কোনো কার্যকারী সমঝোতায় পৌঁছানোর সদিচ্ছা নিয়ে তিনি মারাত্মকভাবে সন্দিহান।
বৈঠকে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার তিনটি সম্ভাব্য পথ বা বিকল্প নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করা হয়—প্রথমত, কঠোর কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা অব্যাহত রাখা; দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালি ও সামুদ্রিক নৌপথগুলোতে কার্যকর নৌ অবরোধ বজায় রেখে তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ধ্বংস করা; এবং তৃতীয়ত, প্রয়োজন দেখা দিলে পুনরায় ব্যাপকভাবে সরাসরি সামরিক হামলায় অবতীর্ণ হওয়া।
ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, অর্থনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটে পর্যুদস্ত তেহরানের জ্বালানি ঘাটতি ও পেট্রল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন জনগণের অসন্তোষ তীব্র করে তুলেছে। তাই এখনই ইরানের ওপর চতুর্মুখী চাপ অব্যাহত রাখার সর্বোত্তম সময়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের প্রভাব টিকিয়ে রাখতে ইরান বর্তমানে কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালি’-কে তাদের শেষ কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ তোলেন নেতানিয়াহু।
সিরিয়ায় অবস্থান ও সীমান্ত নিরাপত্তা:
সিরিয়ার পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনায় নেতানিয়াহু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি ভৌগোলিক মানচিত্র প্রদর্শন করেন। সেই মানচিত্রে তিনি সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির প্রেক্ষাপটের সাথে দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েল কর্তৃক স্থাপিত বাফার জোনের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি ট্রাম্পকে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র জেনোফোবিক ও জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর হুমকি বহাল থাকা পর্যন্ত দক্ষিণ সিরিয়ার ওই বাফার জোনে নিজেদের সার্বভৌম সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহার করবে না তেল আবিব।
সৌদি পারমাণবিক চুক্তি ও মার্কিন সহযোগিতা হ্রাস:
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রস্তাবিত বহুল আলোচিত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি নিয়েও কথা হয়। ট্রাম্প এই চুক্তিকে সৌদি-ইসরায়েল ঐতিহাসিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করলেও নেতানিয়াহু জানান, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেই কেবল ইসরায়েল তাদের নিজস্ব সরকারি অবস্থান পরিষ্কার করবে।
একই সাথে নেতানিয়াহু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সহায়তার ওপর ইসরায়েলের এক দশকের পুরোনো নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার একটি সাহসী প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন থেকে মুক্ত থেকে প্রতিরক্ষা খাতে ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হতে হবে।
এ লক্ষ্য পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি নতুন দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সমঝোতা স্মারকের (MoU) প্রস্তাব করেন তিনি। এই প্রস্তাবনায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি মার্কিন সহায়তার পাশাপাশি আয়রন ডোম ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের সাহায্য চাওয়া হয়। পাশাপাশি উভয় দেশের উন্নত প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ অস্ত্র উদ্ভাবনের লক্ষ্যে যৌথভাবে ১৬ বিলিয়ন ডলারের একটি শক্তিশালী গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়ন তহবিল গঠনের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
|