ওপেনএআইতে মালিকানা নিতে পারে মার্কিন সরকার
তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক : বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তি বাজারের সবচেয়ে আলোচিত ও দ্রুত বর্ধনশীল খাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence)-এর অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সাফল্যে এবার সরাসরি সাধারণ মানুষকে অংশীদার করার এক বৈপ্লবিক ও ঐতিহাসিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার। প্রযুক্তির এই জয়যাত্রার সুফল যেন কেবল গুটিকয়েক করপোরেট ধনকুবেরের পকেটে না গিয়ে সাধারণ নাগরিকদের কাছে পৌঁছায়, সে লক্ষ্যে বিশ্বের শীর্ষ টেক জায়ান্ট ও চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ওপেনএআই’ (OpenAI)-এর সম্ভাব্য মালিকানা অংশীদারত্ব বা শেয়ার নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আজ রবিবার (৭ জুন) বেলা ১১টা ৭ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান’ এবং ‘গ্লোবাল টেক ট্রেন্ডস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি ও সিলিকন ভ্যালি অর্থনীতি পর্যবেক্ষণ উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে ওপেনএআইতে মার্কিন সরকারের মালিকানা নেওয়ার নেপথ্য সমীকরণ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রভাবশালী বিজনেস সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি (CNBC)-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওপেনএআইয়ের সঙ্গে মার্কিন ফেডারেল সরকারের সম্ভাব্য শেয়ার বা মালিকানা অংশীদারত্ব নিয়ে হোয়াইট হাউজের নীতিনির্ধারকদের এক উচ্চপর্যায়ের গোপন আলোচনা চলছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে এক বিবৃতিতে বলেছেন, “সিলিকন ভ্যালির শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সাথে আমরা এমন কিছু সম্পূর্ণ নতুন ও অভিনব ধারণা নিয়ে আলোচনা করছি, যার মূল লক্ষ্য হলো আমেরিকার সাধারণ জনগণও যেন এসব ভবিষ্যৎ বিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ অংশীদার বা শেয়ারহোল্ডার হতে পারে।”
খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ওপেনএআইয়ে সরকারের সম্ভাব্য সরকারি শেয়ার থেকে একটি ঐতিহাসিক ‘পাবলিক ওয়েলথ ফান্ড’ (Public Wealth Fund) বা রাষ্ট্রীয় কল্যাণ তহবিল গঠন করা হতে পারে। এই সার্বভৌম তহবিল থেকে অর্জিত বার্ষিক আয়ের একটি বড় অংশ বা মেগা ডিভিডেন্ড সরাসরি মার্কিন নাগরিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিতরণ করার একটি যুগান্তকারী প্রস্তাবও টেবিলে রয়েছে। এর মাধ্যমে এআই প্রযুক্তির কারণে কর্মসংস্থান হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি অর্থনৈতিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে ট্রাম্প প্রশাসন।
আরেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ (Bloomberg) তাদের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে যে, ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) স্যাম অল্টম্যান (Sam Altman) মূলত ২০২৫ সালের প্রথম দিক থেকেই বিশ্বের বড় বড় এআই ডেভলপার ও ফ্রন্টলাইনার প্রতিষ্ঠানে সরকারি মালিকানা বা রাষ্ট্রীয় অংশীদারত্বের এই বিশেষ ধারণাটি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও মার্কিন সিনেটরদের সাথে তলে তলে আলোচনা চালিয়ে আসছিলেন। এআই মডেলগুলোর বিশাল কম্পিউটিং শক্তি ও বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সরকারি গ্রিড ও রাষ্ট্রীয় সহায়তার বিপরীতে এই শেয়ার দেওয়ার মডেলটি অল্টম্যান নিজেই প্রস্তাব করেছিলেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ধারণার সাথে সুর মিলিয়েছেন মার্কিন ডেমোক্র্যাট শিবিরের প্রবীণ ও প্রভাবশালী সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও (Bernie Sanders)। তিনি এআই কোম্পানিগুলোর ওপর এক বিশেষ ও কঠোর ‘এককালীন কর’ (One-time Tax) আরোপের জন্য একটি নতুন আইনি খসড়া প্রস্তাব পেশ করেছেন। স্যান্ডার্সের প্রস্তাব অনুযায়ী, ওপেনএআই (OpenAI), অ্যানথ্রপিক (Anthropic) এবং ইলন মাস্কের এক্সএআই (xAI)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো নগদ অর্থের বদলে তাদের কোম্পানির মোট মূল্যায়নের ‘৫০ শতাংশ শেয়ার’ এককালীন কর হিসেবে সরাসরি মার্কিন জনগণকে সমর্পণ করবে। এতে সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্র এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ উন্নয়নে সরাসরি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় বসার সুযোগ পাবে।
রাষ্ট্রীয় কল্যাণ ফান্ডের এই ধারণাটি সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় মনে হলেও, মার্কিন সিলিকন ভ্যালির বড় বড় ধনকুবের ও প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীরা এই সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সরকারি হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন। বিখ্যাত মার্কিন প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী ডেভিড স্যাকস (David Sacks) এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, “এমন অদ্ভুত এবং জোরপূর্বক পদক্ষেপের ফলে মুক্ত বাজার অর্থনীতি ধ্বংস হবে এবং সরকার ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক বিপজ্জনক ও অতিরিক্ত ক্রনি-ডিপেনডেন্সি বা অনৈতিক নির্ভরশীলতা তৈরি করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে এআই প্রযুক্তির উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে স্থবির করে দিতে পারে।” তবে এই নানামুখী বিতর্ক ও সমালোচনার মধ্যেও এআই শিল্পের জ্যামিতিক প্রসারের কারণে কোম্পানিগুলোর মালিকানা, ডেটা নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বার্থের প্রশ্নটি ২০২৬ সালের বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
জান্নাত সকালবেলা
|