তথাকথিত হালালা সেন্টার: শরিয়তের পবিত্র বিধান নিয়ে ধৃষ্টতার অভিযোগ

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০১:৪০ অপরাহ্ণ
তথাকথিত হালালা সেন্টার: শরিয়তের পবিত্র বিধান নিয়ে ধৃষ্টতার অভিযোগ
ছবি: ফেইসবুক

বিশেষ প্রতিবেদক: ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ে একটি অত্যন্ত পবিত্র ও উত্তম সামাজিক বন্ধন। কিন্তু এই ধর্মীয় অনুভূতি ও স্পর্শকাতর বিষয়টিকে পুঁজি করে সামাজিকভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং সাইবার ব্ল্যাকমেইলিংয়ের এক অভিনব চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। ‘Sanzida Akter’ নামের একটি বহুল আলোচিত ভুয়া ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে তথাকথিত ‘হালালা সেন্টার’ খুলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে অবশেষে এর মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। 

গতকাল সোমবার (৮ জুন) রাত প্রায় ১১টায় ওই ভুয়া আইডি থেকেই একটি পোস্টের মাধ্যমে তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

আইডি থেকে দেওয়া শেষ পোস্টে লেখা হয়, ‘বিনা ওয়ারেন্টে পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করছে। বর্তমানে আমি উত্তরা থানাতে আছি। আল্লাহ সহায় হোন’। তবে এই গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া না গেলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক অনুসন্ধানে এবং ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর তদন্তে এই চক্রের পেছনে থাকা কতিপয় নামধারী মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং বাইরের অন্য ব্যাকগ্রাউন্ডের এক শ্রেণির অসাধু লোকের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর রূপ বেরিয়ে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে নিজেকে ‘আলেমা সানজিদা আক্তার’ দাবি করে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের শেষ চেষ্টা চালানো হয়েছিল। আইডিটিতে একটি পোস্ট দিয়ে দাবি করা হয়, তিনি কওমী মাদরাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি ‘দাওরায়ে হাদিস’ পাস করেছেন এবং প্রমাণস্বরূপ একটি রেজাল্ট বা সনদও পেশ করেন। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধান ও তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই রেজাল্ট এবং পরিচয় সম্পূর্ণ জাল ও ভুয়া, যা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে এবং ধর্মীয় লেবাস ব্যবহার করে প্রতারণার ফাঁদ পাততে তৈরি করা হয়েছিল।

এই চক্রটির মূল অস্ত্র ছিল অন্যের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ছবি চুরি করে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। ফ্যাক্টচেকিং প্রক্রিয়া ও রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা গেছে, ‘Sanzida Akter’ আইডিতে ব্যবহৃত প্রোফাইল ছবিটি মূলত ‘Joy’s queen’ নামের একটি টিকটক অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি করা। একইভাবে কাভার ফটোটি নেওয়া হয়েছে ‘Dola Mallik’ নামের আরেকটি টিকটক অ্যাকাউন্ট থেকে।

শুধু তাই নয়, চক্রটি গত ৭ জুন একটি রেস্টুরেন্টে বসা কয়েকজন নারী ও পুরুষের কিছু ছবি পোস্ট করে দাবি করে, সেটি ‘হালালা সেন্টার ও এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ নিয়ে দেশের আলেম সমাজের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের ছবি। কিন্তু অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়, ছবিগুলো মূলত ‘Hafez Yousuf Abtahi’ নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক পোস্ট থেকে চুরি করা, যা ছিল সম্পূর্ণ তাঁদের একটি ঘরোয়া পারিবারিক ডিনারের মুহূর্ত। ছবি চুরির শিকার হাফেজ ইউসুফ আবতাহী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তাঁর পারিবারিক ছবি অপব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে এবং এই চক্রের বিরুদ্ধে তিনি ইতোমধ্যে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন ও আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

আইডিটির ইতিহাস (History) পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, এটি একটি সুসংগঠিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুয়া আইডি। ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে আইডিটি খোলার পর একই দিনে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘মুফতি জিয়া বিন কাসেম’। এরপর ১০ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে ‘স্বপ্নের ব্যাখ্যা - Dream Explanation’, ১০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ‘Muhaddisa Apu’ এবং সর্বশেষ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে পুনরায় ‘Sanzida Akter’ করা হয়। অর্থাৎ, কখনও মুফতি, কখনও মুহাদ্দিসা আবার কখনও সাধারণ নারী সেজে বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের পরিচয় ব্যবহার করে আইডিটি পরিচালনা করা হচ্ছিল।

এমনকি ৬ জুন ‘হালালা সেন্টার’ সংক্রান্ত আরেকটি পোস্টে মুফতি কেফায়াতুল্লাহ কাশফি নামের এক বিশিষ্ট আলেমকে উক্ত প্রতিষ্ঠানের ‘মুহাল্লিল’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে মুফতি কেফায়াতুল্লাহ কাশফি নিজেই ফেসবুকের কমেন্টে লেখেন, “আমার ছবি এড করার কারণ কি? দ্রুত রিমুভ করুন, অন্যথায় আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো”। পরবর্তীতে জানা যায়, ফেসবুকে সবাই যখন এই হালালা সেন্টার নিয়ে মজার ছলে কথা বলছিল, তিনিও তখন হালকা রসিকতা করে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু সেই মন্তব্য ও তাঁর প্রোফাইল ছবি অপব্যবহার করে এই ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর পোস্ট তৈরি করা হয়।

ধর্মীয় অনুভূতির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিয়ের মতো একটি উত্তম বিষয়কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভাবে বিকৃত ও বাজেভাবে উপস্থাপন করার পেছনে কোনো বড় সাইবার অপরাধী চক্র কাজ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। উত্তরা থানায় ওই নারীর অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর এখন এই চক্রের বাকি সদস্যদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

মন্তব্য করুন