একটি লিটার তেলের অপেক্ষা ও একটি জীবনের করুণ সমাপ্তি

একটি লিটার তেলের অপেক্ষা ও একটি জীবনের করুণ সমাপ্তি

আবু হামদান: জীবন কখনো কখনো এমন সব মোড়ে এসে দাঁড়ায়, যেখানে তুচ্ছ এক প্রয়োজনও হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী। দিনাজপুরের কাহারোলে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বেসরকারি চাকরিজীবী এনায়েতুল করিমের মৃত্যুর সংবাদটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক চরম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে ছুটিতে বাড়ি আসা এনায়েত হয়তো ভেবেছিলেন, দ্রুত তেল নিয়ে ফিরবেন শ্বশুরবাড়ি থেকে। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! এক লিটার তেলের অপেক্ষা করতে করতে চিরকালের জন্য ফুরিয়ে গেল তাঁর জীবনের সব লেনদেন। 

মোটরসাইকেলের ট্যাংক পূর্ণ হওয়ার আগেই নিভে গেল তাঁর জীবনের প্রদীপ। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়া এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যু—এই পুরো ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, সামান্য তেলের জন্য একজন মানুষকে কতটা শারীরিক ও মানসিক ধকল পোহাতে হয়।

একজন সাধারণ চাকরিজীবী, যিনি হয়তো শত মাইল দূরে কর্মস্থলে থেকে মাস শেষে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন দেখতেন; সেই স্বপ্নের মৃত্যু হলো একটি ফিলিং স্টেশনের ধুলোবালি আর অপেক্ষার লাইনে। তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে একটি পরিবার শুধু একজন সদস্যকেই হারায়নি, হারিয়েছে তাদের আগামীর ভরসা ও ছায়াকে।

তেলের লাইনে কেন এত ভিড়? কেন একজন সুস্থ মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার ধকল সইতে হবে? এসব প্রশ্ন হয়তো আইনের খাতায় বড় কোনো জায়গা পাবে না। হয়তো 'স্বাভাবিক মৃত্যু' বা 'অসুস্থতা'র তকমা দিয়ে এই ঘটনার ফাইল বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের নৈতিকতার আদালতে এই প্রশ্নগুলো থেকেই যাবে—একটি সাধারণ নাগরিক সুযোগ-সুবিধার জন্য আমাদের আর কতটুকু মূল্য দিতে হবে?

এনায়েতুল করিমের এই প্রস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি সেকেন্ড কতটা মূল্যবান। তেলের লাইনের সেই দীর্ঘ সারি হয়তো একদিন ছোট হয়ে আসবে, কিন্তু তাঁর পরিবারের শূন্যতা কোনোদিন পূর্ণ হবে না। আমরা নিহত এনায়েতুল করিমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক: অক্ষরবিডি

মন্তব্য করুন