অনক আলী হোসেন শাহিদী :
বাংলাদেশের উন্নয়নের মূলভিত্তি কৃষি। খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, পশুপালন উন্নয়ন এবং কৃষি প্রযুক্তির অগ্রগতি—এই চারটি ক্ষেত্র আজ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারকের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পশুপালন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া-এর নাম বিশেষভাবে আলোচিত হতে পারে।
বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-এর ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা, গবেষণা এবং প্রশাসনিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা তাঁকে দেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিতে পরিণত করেছে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায়, বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের নীতিনির্ধারণে তাঁর মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বকে সম্পৃক্ত করা কতটা যৌক্তিক হতে পারে—তা আজ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
শিক্ষা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতা
প্রফেসর ড. ফজলুল হক ভূঁইয়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ও এমএসসি উভয় ক্ষেত্রেই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট অর্জন করেন। পরে তিনি যুক্তরাজ্যের University of London থেকে পশু প্রজনন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
এরপর জাপান, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রে পোস্টডক্টরাল গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে তিনি বিশ্বমানের গবেষণা অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। জার্মানির University of Hohenheim-এ অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসর হিসেবে কাজ করাও তাঁর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ বহন করে।
গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানচর্চার অবদান
দেশের প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বিশেষত বাংলাদেশ রেড চিটাগাং ক্যাটল জাতের উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা দেশের গবাদিপশু উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে।
তাঁর গবেষণা অবদানের পরিসংখ্যানই তাঁর বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার পরিচয় বহন করে—
- ৭টি গবেষণা গ্রন্থ
- ৬৭টি কী-নোট ও প্রসিডিংস প্রকাশনা
- ১৮৬টি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ
এছাড়া তিনি World Bank, United Nations Environment Programme এবং United States Department of Agriculture-এর অর্থায়নে বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে সংস্কার ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা
ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে তাঁর প্রায় দেড় বছরের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অনিয়ম প্রতিরোধ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার প্রচেষ্টা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোকে স্থিতিশীল করা, শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ—এসব উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে সংস্কারের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বৃহৎ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের জটিল প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার অভিজ্ঞতা একজন শিক্ষাবিদকে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার ক্ষেত্রেও সক্ষম করে তোলে।
রাষ্ট্রনীতি ও কৃষি খাতের নীতিনির্ধারণে সম্ভাবনা
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, পশুপালন উৎপাদনশীলতা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশ্নে নীতিগত সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, গবেষণা নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক দক্ষতা—এই তিনটির সমন্বয় খুব কম ব্যক্তির মধ্যেই দেখা যায়। প্রফেসর ড. ফজলুল হক ভূঁইয়া সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন বলে অনেকেই মনে করেন।
নীতিনির্ধারণে সম্ভাব্য ভূমিকা
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যদি তারেক রহমান-এর নেতৃত্বাধীন সরকার কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করার উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে এ খাতে গবেষণা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বদের সম্পৃক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পশুপালন বিজ্ঞানী, দীর্ঘদিনের শিক্ষক এবং সফল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসক হিসেবে প্রফেসর ড. ফজলুল হক ভূঁইয়া নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার মতো অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ধারণ করেন। ফলে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর মতো একজন বিশেষজ্ঞকে বিবেচনা করা হলে তা গবেষণাভিত্তিক রাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে সহায়ক হতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
উপসংহার
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে গবেষণা, শিক্ষা এবং নীতিনির্ধারণের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে রাষ্ট্রনীতিতে প্রয়োগ করার মধ্য দিয়েই একটি টেকসই কৃষি অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রফেসর ড. এ. কে. ফজলুল হক ভূঁইয়ার মতো অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও গবেষকের রাষ্ট্রনীতিতে সম্পৃক্ততা শুধু একটি ব্যক্তিগত নিয়োগের প্রশ্ন নয়; বরং এটি হতে পারে গবেষণাভিত্তিক কৃষি উন্নয়নের একটি নতুন দৃষ্টান্ত।