বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যাত্রা শুরু ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান একটি প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক ছাত্রশক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে সংগঠনটি গঠন করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং বিএনপিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন করতে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা রাজপথে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছেন। বিশেষ করে ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদলের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় অম্লান হয়ে আছে।
নব্বই-পরবর্তী সময়ে ছাত্রদলের সেই চিরচেনা জৌলুস ও রাজপথের একচ্ছত্র আধিপত্যে কিছুটা ভাটা পড়লেও, ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংগঠনটি আবারও তাদের সাংগঠনিক শক্তির জানান দিয়েছে। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্রদল এখন এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
বর্তমানে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের নেতৃত্বাধীন কমিটির দুই বছরের মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের চিত্রও একই। ২০২৪ সালের ১ মার্চ গণেশ চন্দ্র রায় সাহসকে সভাপতি এবং নাহিদুজ্জামান শিপনকে সাধারণ সম্পাদক করে যে সাত সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল, তার মেয়াদও ইতোমধ্যে এক বছর অতিক্রম করেছে। ফলে কেন্দ্র থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়— সর্বত্রই এখন বইছে নতুন নেতৃত্ব পরিবর্তনের হাওয়া।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপির তেজগাঁও কার্যালয়ে তারেক রহমান তার রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে উপদেষ্টারা দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার পরামর্শ দেন। এরপর থেকে বিএনপির অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের মতো ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং অন্যতম প্রধান ইউনিট— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় নতুন নেতৃত্ব আসার গুঞ্জন নেতাকর্মীদের মাঝে জোরালো হয়েছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও ঢাবি শাখায় নতুন কমিটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে কমিটি ভেঙে দেওয়ার গুঞ্জন থাকলেও বিএনপির নির্বাচনী বিজয়ের পর পদপ্রত্যাশী নেতাদের তৎপরতা আরও বেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন শোডাউন, শিক্ষার্থীদের নিয়ে ইফতার মাহফিল এবং দলীয় কর্মসূচির মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান জানান দিচ্ছেন।
শীর্ষ পদপ্রত্যাশী একাধিক নেতা জানান, কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে থেকেই নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা ছিল। এখন মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় সেই প্রত্যাশা আরও তীব্র হয়েছে। সাধারণ নেতাকর্মীরা নতুন কমিটির অপেক্ষায় এখন ‘চাতক পাখির মতো’ তাকিয়ে আছেন।
সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, ‘গত ১ মার্চ আমাদের দুই বছর মেয়াদি কমিটির সময়সীমা শেষ হয়েছে। আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান যখন চাইবেন, তখনই নতুন কমিটি হবে। তবে এখনই কমিটি হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। বর্তমানে অমর একুশে বইমেলায় আমাদের স্টল ও অন্যান্য সাংগঠনিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদপ্রত্যাশীরা তাদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরছেন, যা আমাদের নজরে এসেছে। তবে কমিটির পরিবর্তনের চূড়ান্ত সময়টি এখনই বলা যাচ্ছে না।’
সভাপতি পদপ্রত্যাশী ও বর্তমান কমিটির ১নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান বলেন, ‘মেয়াদ শেষ হওয়ায় আমরা দ্রুত নতুন কমিটির অনুরোধ জানাচ্ছি। গত ১৭ বছরে অসংখ্যবার নির্যাতন ও কারাবরণ করেছি। সুযোগ পেলে তারেক রহমানের ৩১ দফা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ছাত্রদলকে ভ্যানগার্ড হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’
ছাত্রদলের পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ‘সিলেকশন’ পদ্ধতির পরিবর্তে দলীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে শাখা ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ১১ মে একইভাবে কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচন করে চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রদল।
ভোটের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীরা ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত কোনো কমিটি মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পদে থাকা সাংহর্ষিক। সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল রাখতে এবং নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে নিয়মিত নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।
নেতাকর্মীদের মতে, এবার কাউন্সিলের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের জোর গুঞ্জন রয়েছে। তারা চান রাজপথে পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করে গণতান্ত্রিক উপায়ে নতুন কমিটি গঠন করা হোক। এতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক পক্ষপাতিত্ব বা পছন্দের কাউকে নেতৃত্বে বসানোর সুযোগ থাকবে না। বিএনপির অন্যান্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মতো ছাত্রদলেও এই মডেল অনুসরণের সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক স্বয়ং তারেক রহমান। ফলে ছাত্রদলের কমিটি বা সাংগঠনিক বিষয়ে তিনি নিজেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।’
নতুন নেতৃত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। যেহেতু কমিটির মেয়াদ শেষ, তাই যেকোনো সময় পরিবর্তন আসতে পারে। ফ্যাসিস্ট আমলে ছাত্রদলের পরীক্ষিত, যোগ্য ও নির্যাতিত এবং যাদের সাংগঠনিক দক্ষতা রয়েছে— তাদের মাধ্যমেই নতুন কমিটি গঠন করা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী শিক্ষার্থীদের নতুন ধারার রাজনীতির সঙ্গে মানানসই ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব নির্বাচন করা জরুরি।
আই.এ/সকালবেলা