বোয়িং কিংবা সর্বাধুনিক এফ-৩৫, পাখির সামনে কেন সব প্রযুক্তিই এত অসহায়?

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৮ অপরাহ্ণ
বোয়িং কিংবা সর্বাধুনিক এফ-৩৫, পাখির সামনে কেন সব প্রযুক্তিই এত অসহায়?
আকাশের পালকযুক্ত শত্রুর কাছে অসহায় বিশ্বের অতি-উন্নত বিমান প্রযুক্তি

অনলাইন ডেস্ক: আধুনিক সামরিক ও বেসামরিক বিমান চলাচল খাত প্রযুক্তির দিক থেকে আজ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছে। শক্তিশালী টার্বোফ্যান ইঞ্জিন, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রেডার এবং ধারালো সেন্সর ব্যবস্থার বদৌলতে আকাশপথ এখন অনেক বেশি দ্রুত ও নিরাপদ। কিন্তু এতসব অভাবনীয় বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের পরও আকাশসীমায় বৈমানিকদের জন্য এক চিরন্তন ও অদম্য আতঙ্ক হিসেবে থেকে গেছে ডানা মেলে উড়ে চলা ছোট্ট পাখি। আকাশের এই পালকযুক্ত শত্রুর সাথে উড়োজাহাজের সংঘাত, যা বৈমানিক পরিভাষায় ‘বার্ড স্ট্রাইক’ (Bird Strike) নামে পরিচিত, প্রতিনিয়ত যেমন শত শত কোটি টাকার ক্ষতি করছে, তেমনি মাঝে মাঝেই সৃষ্টি করছে প্রাণঘাতী মহা-বিপর্যয়।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনার মার্টেল বিচ থেকে উড্ডয়নের পরপরই আমেরিকান এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ পরিযায়ী পাখির ঝাঁকের মুখোমুখি হয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ১৮১ জন আরোহী নিয়ে উড্ডয়নের কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বিমানটির বাঁ পাশের ইঞ্জিনে একাধিক পাখি ঢুকে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনে বিকট শব্দে অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং ধোঁয়া নির্গত হতে থাকে। ককপিট থেকে পাইলট তড়িঘড়ি ‘মেডে, মেডে’ জরুরি বার্তা পাঠালে রানওয়েতে প্রচুর পাখির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

বৈমানিক পরিভাষায় এসব পাখির অবশিষ্টাংশকে বলা হয় 'স্নার্জ' (Snarge)। এই স্নার্জ সংগৃহীত করে ওয়াশিংটন ডিসির বিখ্যাত স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়, যাতে সুনির্দিষ্ট প্রজাতি শনাক্ত করে ভবিষ্যতে তা প্রতিরোধের আগাম ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (FAA) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল ২০২৫ সালেই যুক্তরাষ্ট্রে ২৪ হাজারেরও বেশি বন্যপ্রাণী ও পাখির সাথে বিমানের সংঘাতের তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে। বিমানের ইঞ্জিন, ডানা, উইন্ডশিল্ড ও সামনের রেডোম সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। বিশালাকার টার্বোফ্যান ইঞ্জিনে পাখি ঢুকে পড়লে বাতাসের চাপে ব্লেড ভেঙে আগুন ধরে যেতে পারে।

ইতিহাস ঘাটে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকক থেকে দক্ষিণ কোরিয়াগামী জেজু এয়ারের একটি বোয়িং ৭৩৭ বিমান অবতরণের সময় বৈকাল হাঁসের ঝাঁকের মুখে পড়ে দুটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে আছড়ে পড়লে ১৭৯ জন আরোহী প্রাণ হারান। ২০১৯ সালে রাশিয়ার উরাল এয়ারলাইন্সের একটি বিমান গাংচিলের ঝাঁকের আঘাত খেলে চালক অলৌকিকভাবে ভুট্টা ক্ষেতে জরুরি অবতরণ করিয়ে ২৩৩ জন আরোহীকে রক্ষা করেন।

কেবল বেসামরিক যাত্রীবাহী বিমানই নয়, সামরিক বাহিনীর সর্বাধুনিক একক ইঞ্জিনের যুদ্ধবিমানগুলোর জন্যও পাখি এক মূর্তিমান আতঙ্ক। হালকা ও প্রচণ্ড গতিতে নিচু উচ্চতায় ওড়ার সময় পাখির আঘাতে উইন্ডশিল্ড ভেঙে পাইলট অচল হয়ে পড়তে পারেন।

প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমানও এর ব্যতিক্রম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ কোরীয় বিমান বাহিনীর সর্বাধুনিক ‘এফ-৩৫ লাইটনিং-টু’ (F-35 Lightning II) যুদ্ধবিমানও পাখির আঘাতে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোটি ডলারের এফ-৩৫এ বিমানের এয়ার ইনটেকের ভেতর একটি মাত্র ঈগল ঢুকে পড়লে বিমানটির অভ্যন্তরীণ বাল্কহেড, হাইড্রোলিক ও মেকানিক্যাল সিস্টেম এমনভাবে ধ্বংস হয় যে, শেষমেশ বিমানটিকে চিরতরে অবসরে পাঠাতে বাধ্য হয় সে দেশের কর্তৃপক্ষ। ফলে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, প্রকৃতির ক্ষুদ্র এ প্রাণীদের সামনে আকাশপথের যানগুলো যেন আজও অত্যন্ত ভঙ্গুর।

মন্তব্য করুন