অনুমোদনের অপেক্ষায় বহু সিনেমা, কার্যক্রমে স্থবিরতা

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৬ অপরাহ্ণ
অনুমোদনের অপেক্ষায় বহু সিনেমা, কার্যক্রমে স্থবিরতা

বিনোদন প্রতিবেদক: দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে দীর্ঘ দিন ধরে চলচ্চিত্র আমদানি-রপ্তানি কমিটির কার্যত কোনো কার্যক্রম বা দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় বিপাকে পড়েছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। কমিটির এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার কারণে বিদেশি সিনেমা আমদানি ও রপ্তানির অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ আবেদন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি হয়ে ঝুলে আছে বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে যেমন বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন চলচ্চিত্র প্রযোজক ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো, অন্যদিকে নতুন ও মানসম্মত সিনেমার তীব্র অভাবে প্রদর্শনের কিছু না পেয়ে চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন সিনেমাহল মালিকরা।

জানা গেছে, বছরদুয়েক আগে দেশে চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠনের পর এই আমদানি-রপ্তানি কমিটি নতুন করে পুনর্গঠন করা হয়েছিল। এরপর ‘সাফটা’ (SAFTA) চুক্তির আওতাভুক্ত করে নির্দিষ্ট পাঁচ শর্তসাপেক্ষে বিদেশি চলচ্চিত্র বাংলাদেশে আমদানির আইনি অনুমোদন দেয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। তবে সিনেমা ব্যবসার সাথে জড়িতদের অভিযোগ, গত জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই এই বিশেষ কমিটির কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। এমনকি বিগত কয়েক মাস ধরে নীতি নির্ধারণী কোনো সভাও অনুষ্ঠিত হয়নি।

এই চরম অচলাবস্থার কারণে একাধিক প্রযোজনা ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বৈধ উপায়ে বিদেশি সিনেমা আমদানি ও রপ্তানির আবেদন জমা দিলেও কোনো এক অজানা কারণে সেগুলোর ছাড়পত্র বা চূড়ান্ত অনুমোদন মিলছে না। চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকের ধারণা, এই কমিটি হয়তো ইতিমধ্যে ভেঙে গেছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, কাগজে-কলমে কমিটি থাকলেও বাস্তবে সেটি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়।

এই সংকটের ভুক্তভোগী দেশের অন্যতম শীর্ষ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ইন-উইন এন্টারপ্রাইজ’। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দুই মাস আগে পাঁচটি জনপ্রিয় থাই (Thailand) সিনেমা আমদানির জন্য বাণিজ্যিক আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের কোনো সাড়া পায়নি। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার এবং প্রদর্শক সমিতির সাবেক সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে বড় ধরনের ব্যবসায়িক ক্ষতির কথা উল্লেখ করে বলেন, “এমনিতেই আমাদের পর্যাপ্ত দেশি সিনেমা নেই। সিনেমা চালাতে না পারলে তো হল টিকিয়ে রাখা যাবে না। বিদেশি ছবি আমদানির আবেদন করেও মুক্তির অনুমতি পাচ্ছি না। দীর্ঘদিন কমিটির কোনো সভাও হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে এখন আমাদের সিনেমাহল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। থাই ছবিগুলো এনে বিপুল পয়সা খরচ করে বাংলায় ডাবিং করে রেখেছি, কিন্তু অনুমোদন না পাওয়ায় এখন হাত গুটিয়ে বসে আছি। মন্ত্রণালয়ের উচিত হল মালিকদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে দ্রুত এগুলো অনুমোদনের ব্যবস্থা করা।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও একজন প্রযোজক জানান, দেশীয় সিনেমার এই খরা মৌসুমে প্রেক্ষাগৃহগুলোকে সচল ও উজ্জীবিত রাখতে বিদেশি ছবি প্রদর্শন দারুণ ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু তিনিও বেশ কয়েকটি সিনেমার আবেদন জমা দিয়ে কোনো উত্তর পাননি।

তবে চলচ্চিত্র আমদানি ও রপ্তানি কমিটি ভেঙে যাওয়ার গুঞ্জনটি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন কমিটির অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ও চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে পুনর্গঠিত এই কমিটিতে যুক্ত হওয়া এই পরিচালক বলেন, “কমিটি ভাঙেনি, এখনো বহাল আছে। তবে চলচ্চিত্র আমদানি-রপ্তানির চূড়ান্ত অনুমোদনের মূল বিষয়টি তো দেখভাল করে মন্ত্রণালয়। কেন ছবিগুলো আটকে আছে বা অনুমোদন পাচ্ছে না, সেটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাই ভালো বলতে পারবেন।” শাহীন সুমনের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কিছুটা অনিশ্চয়তার কারণে এই আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে সাময়িক স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় এই জটিলতা দ্রুত কেটে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা ফাইলগুলোর বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের চলচ্চিত্র বিভাগের উপসচিব (চলচ্চিত্র-২) শারমীন আখতারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিশ্চিত করেন যে, বর্তমান কমিটি এখনো বহাল রয়েছে এবং জমা পড়া আবেদনগুলো নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “নতুন কমিটি গঠনের আগ পর্যন্ত এই কমিটিই সব সিদ্ধান্ত নেবে। আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই আগামী সপ্তাহে তথ্য মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ সভা আহ্বান করা হয়েছে।”

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আটকে থাকা এসব আবেদন যাচাই-বাছাই ও চূড়ান্ত অনুমোদনের লক্ষ্যে আগামী ৭ জুলাই তথ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে দুপুর আড়াইটায় এক উচ্চপর্যায়ের সভা ডাকা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে থাকা এসব আবেদন এই সভায় নিষ্পত্তি হলে বিদেশি সিনেমা আমদানির পথ আবারও উন্মুক্ত হবে এবং দেশের ঝিমিয়ে পড়া সিনেমাহলগুলো আবার দর্শকদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন চলচ্চিত্র বোদ্ধারা।

মন্তব্য করুন