শ্রমিকদের ভাগ্য কি বদলাচ্ছে?

জান্নাতুল ফেরদৌস
প্রকাশ: শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ০৩:৪৩ অপরাহ্ণ
শ্রমিকদের ভাগ্য কি বদলাচ্ছে?

আজ ১ মে ২০২৬, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকদের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রশ্ন থেকে যায়—বাংলার শ্রমিকের ভাগ্য কি আদৌ বদলেছে? রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নানা আনুষ্ঠানিকতা আর সভা-সমাবেশ হলেও সাধারণ শ্রমিকের জীবনে তার প্রতিফলন এখনো সামান্যই।

অসম আর্থ-সামাজিক কাঠামো: পুঁজিবাদের আগ্রাসনে আজ সাধারণ শ্রমিকরা জিম্মি। দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বাড়লেও শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য আকাশচুম্বী। একশ্রেণির মুনাফাখোর ও দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠী যখন বিএমডব্লিউতে চড়ে বিলাসী জীবন কাটাচ্ছে, তখন গার্মেন্টস, কৃষি বা নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা জীবনধারণের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। কার্ল মার্কসের সেই 'পুঞ্জীভূত পুঁজি'র নেশায় মত্ত মালিকপক্ষ শ্রমিকের শ্রম ও সময় বাড়িয়ে মুনাফা লুটছে, অথচ শ্রমিকের সঞ্চয় বলে কিছু নেই।

ট্রেড ইউনিয়ন ও আইনি বাধা: শ্রমিকদের ভাগ্য না বদলানোর অন্যতম কারণ হলো শক্তিশালী ও সৎ নেতৃত্বের অভাব। দেশে প্রায় ২ লাখ শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকলেও ট্রেড ইউনিয়ন আছে মাত্র ৮ হাজারের মতো। অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত শ্রমিক নেতারা মালিকপক্ষের সঙ্গে আঁতাত করে নিরীহ শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করছেন। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে ইউনিয়ন করার অধিকার কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা এখনো দুঃসাধ্য।

পরিসংখ্যানের করুণ চিত্র:

  • প্রতি বছর ২০-২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে এলেও রাষ্ট্র কর্মসংস্থান করতে পারছে মাত্র ২ লাখের।

  • বাকিদের বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, যেখানে 'কাজ নাই তো মজুরি নাই' নীতি প্রচলিত।

  • কৃষিখাতে নিয়োজিত ৩ কোটি শ্রমিকের বছরে মাত্র ৩ মাস কাজ থাকে। বাকি সময় তারা চরম অনিশ্চয়তায় ভোগেন।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও নতুন চ্যালেঞ্জ: বর্তমান ডিজিটাল যুগে ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’ শ্রমবাজারের জন্য এক নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষতা অর্জনের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় সাধারণ শ্রমিকরা বেকারত্বের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। উৎপাদন ও বেকারত্বের এই দুষ্টচক্র সমাজের ভারসাম্য ভেঙে ফেলছে।

উপসংহার: জর্জ ওয়াশিংটন যেমন বলেছিলেন, পদের মর্যাদা নয়, মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোই আসল ভদ্রতা—সেই মানসিকতা আজ মালিকপক্ষের মধ্যে অনুপস্থিত। শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে হলে শুধু ১ মে পালন করলেই হবে না, বরং ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস নিশ্চিত করা, ন্যায্য মজুরি এবং বৈষম্যহীন সমাজ কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় অগাস্ট স্পাইসের সেই ভবিষ্যৎবাণী—"আজ আমাদের যে কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে, একদিন আমাদের নীরবতাই তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে"—সত্য প্রমাণিত হতে পারে।

জান্নাত/সকালবেলা

মন্তব্য করুন