দুর্গম পথ: ভালো নেই পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ জনগোষ্ঠী

দুর্গম পথ: ভালো নেই পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ জনগোষ্ঠী

রুপম চাকমা, দিঘীনালা: নয়নাভিরাম পাহাড়, মেঘের আনাগোনা আর সবুজের হাতছানি—বাইরে থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে যতটা সুন্দর মনে হয়, এখানকার সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম ঠিক ততটাই কঠিন। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অভাব, দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থা এবং নিরন্তর অভাবের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা পাহাড়িদের জীবনযাত্রায় আজ নাভিশ্বাস উঠেছে।

পাহাড়ের বুক চিরে চলা আঁকাবাঁকা পথগুলো আজও অনেক দুর্গম। অনেক গ্রামে এখনো পৌঁছায়নি বিদ্যুৎ বা সুপেয় পানির নিশ্চয়তা। দিঘীনালাসহ পার্বত্য অঞ্চলের বহু গ্রামে যেতে এখনো মানুষকে মাইলের পর মাইল দুর্গম পথ হেঁটে বা নৌকায় পাড়ি দিতে হয়। যাতায়াত ব্যবস্থার এই বেহাল দশা সরাসরি প্রভাব ফেলছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাজার ব্যবস্থায়। একজন শিক্ষার্থীকে স্কুলে যেতে কিংবা একজন মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নিতে যে অমানবিক পরিশ্রম করতে হয়, তা আধুনিক যুগে কল্পনা করাও কঠিন।

পার্বত্য জেলাগুলোতে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ এখনো নিশ্চিত হয়নি। দুর্গম এলাকায় পর্যাপ্ত স্কুল নেই, আর যেখানে আছে সেখানে শিক্ষক সংকট ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো একটি নিয়মিত চিত্র। ফলে পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। অনেক এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা প্রশিক্ষিত চিকিৎসক না থাকায় মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুপুষ্টির মতো মৌলিক বিষয়গুলো চরম ঝুঁকির মুখে। সাধারণ রোগব্যাধিও অনেক সময় সুচিকিৎসার অভাবে প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

জীবনের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর সংগ্রামের সাথে যোগ হয়েছে নিরাপত্তাহীনতার চাপ। পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও জাতিগত সহাবস্থান এক সময় শক্তি হলেও, বর্তমানে বিভাজন ও সংঘাতের রাজনীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সব সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত দৃষ্টি নন্দন 'সীমান্ত সড়ক', অসংখ্য কালভার্ট, ব্রিজ ও রাস্তা দুর্গম পাহাড়ের সাথে সমতলের সংযোগ ঘটিয়েছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী এখানকার মানুষের কাছে এখন প্রধান ভরসার স্থল।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা। কৃষি প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটলে মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আরও কার্যকর সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। পাহাড়ের মানুষের জীবনমান উন্নত করতে হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান—এই তিনটির সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

এন.এ/সকালবেলা

মন্তব্য করুন