নাসিরনগরে স্ত্রীকে হত্যার পর বস্তাবন্দি লাশ গুম, ২৪ ঘণ্টায় ঘাতক স্বামী গ্রেপ্তার

প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৯ অপরাহ্ণ
নাসিরনগরে স্ত্রীকে হত্যার পর বস্তাবন্দি লাশ গুম, ২৪ ঘণ্টায় ঘাতক স্বামী গ্রেপ্তার
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে স্ত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা

মোঃ শরীফ উদ্দিন, নাসিরনগর প্রতিনিধি: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে চাঞ্চল্যকর ও নির্মম গৃহবধূ হত্যা মামলার মূল রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর বস্তাবন্দি মরদেহ পুকুরে পাথর চাপা দিয়ে গুম করার ভয়াবহ চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হলো না ঘাতক স্বামীর। ঘটনা জানাজানি হওয়ার এবং মামলা দায়েরের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মূল ঘাতককে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাত ১টা ৫ মিনিটে নাসিরনগর উপজেলার ভলাকুট ইউনিয়নের খাগালিয়া এলাকায় এক চিরুনি অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত আসামির নাম সুশীল দাশ (৩০)। তিনি ওই এলাকার কুড়ের পাড় গ্রামের মৃত মহরলাল দাশের ছেলে।

অভিযানটি যৌথভাবে পরিচালনা করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (SRB-৯), সিপিসি-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং জেলা পুলিশের একটি চৌকস দল।

পুলিশ ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৯ বছর আগে সুশীল দাশের সাথে রত্না রানী দাশের (২৬) সনাতন ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিয়ে হয়। তাঁদের কোলজুড়ে বর্তমানে ৮ বছরের একটি অবুঝ কন্যা সন্তান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে ও নানা তুচ্ছ পারিবারিক বিষয় নিয়ে সুশীল তাঁর স্ত্রীর ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন।

ঘটনার প্রায় এক মাস আগে সুশীল স্ত্রীকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি আর সংসার করবেন না এবং তাঁকে বাপের বাড়ি চলে যেতে বলেন। কিন্তু অবুঝ কন্যাসন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সব অপমান ও নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করেও স্বামীর সংসার আঁকড়ে পড়ে থাকেন রত্না। আর সেই থেকে যাওয়াই তাঁর জীবনে চরম কাল হয়ে দাঁড়াল।

মামলার তদন্তকারী ও থানা পুলিশ জানায়, গত ১৭ অক্টোবর রাতে মেয়েকে নিয়ে খাবার খেয়ে নিজ ঘরে ঘুমিয়ে পড়েন রত্না। পরদিন ১৮ অক্টোবর সকালে তাঁকে ঘরে না পেয়ে স্বামী সুশীল দাশ চতুর্দিকে স্ত্রী নিখোঁজের নাটক সাজান। শুধু তাই নয়, নিজের অপরাধ ঢাকতে তিনি শ্বশুরবাড়িতে মিথ্যা খবর দেন এবং ঘটনা মোড় ঘোরাতে নাসিরনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেন। এর পর থেকে পরিবারের লোকজন বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও রত্নার কোনো সন্ধান পাচ্ছিলেন না।

অবশেষে গত ২১ অক্টোবর দুপুর ১২টার দিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাধ্যমে খবর আসে, সুশীল দাশের বসতবাড়ির দক্ষিণ পাশের পুকুরে একটি সন্দেহজনক বস্তা ভাসছে। খবর পেয়ে রত্নার ভাই দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে বস্তাটি খুলে নিজের বোনের বীভৎস মরদেহ শনাক্ত করেন।

মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ দেখতে পায়, নিহত রত্নার দুই হাত রশি ও কাপড়ের টুকরো দিয়ে শক্ত করে বাঁধা ছিল। মরদেহটি একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে তার সাথে ভারী পাথর বেঁধে পুকুরের পানির নিচে তলিয়ে রাখা হয়েছিল, যাতে পচে গলে না যাওয়া পর্যন্ত কেউ খুঁজে না পায়।

এ বর্বরোচিত ঘটনায় নিহতের ভাই শ্রীনিবাস দাস বাদী হয়ে সুশীল দাশকে প্রধান আসামি করে মোট ৬ জনের বিরুদ্ধে নাসিরনগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (মামলা নং- ২১, তারিখ- ২২ অক্টোবর ২০২৬; ধারা- দণ্ডবিধি ৩০২/২০১/৩৪)।

মামলা রুজুর পরপরই এসআরবি (SRB-৯) ছায়া তদন্ত শুরু করে। আধুনিক প্রযুক্তি ও নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় প্রধান আসামির নিখুঁত অবস্থান শনাক্ত করে গভীর রাতে যৌথ অভিযান চালিয়ে সুশীলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, গ্রেপ্তারকৃত ঘাতক সুশীল দাশকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হচ্ছে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও স্বীকারোক্তি আদায়ে তাঁকে আদালতে প্রেরণ করে রিমান্ডের জোর আবেদন করা হবে। একই সাথে মামলার এজাহারনামীয় বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।

এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পুরো খাগালিয়া এলাকায় শোকের মাতম ও তীব্র জনক্ষোভ বিরাজ করছে। এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবার ঘাতক সুশীল দাশের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন।