অপ্রতীম হত্যা মামলায় তুহিনসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল

প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৪ অপরাহ্ণ
অপ্রতীম হত্যা মামলায় তুহিনসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল
নিহত ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম

কুবি প্রতিনিধি : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমকে (১৩) নৃশংসভাবে হত্যা মামলায় চারজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আদালতে বহুল প্রতীক্ষিত চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেছে পুলিশ।

গত ২০ অক্টোবর আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চার্জশিট দাখিল করা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান।

পুলিশের দাখিলকৃত চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, মূলত আইফোন বা দামি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই বর্বরোচিত পরিকল্পনা করা হয়। মোবাইলটি ছিনিয়ে নিতে বাধা দেওয়ায় শিশু অপ্রতীমকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় সাইফুল ইসলাম তুহিন, মোজাফ্ফর হোসেন ফাহাদ, কামরুল হাসান ও সিয়ামকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, এই চারজন মিলে হত্যাকাণ্ডের পুরো ছক বা পরিকল্পনা তৈরি করেছিল। তবে তাদের মধ্যে সিয়াম ছাড়া বাকি তিনজন—তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন।

ছেলের ঘাতকদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের খবর পেয়ে মামলার বাদী ও নিহত অপ্রতীমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, “তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে কল করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আমার নিষ্পাপ ছেলেকে ঘিরেই আমাদের সব বাঁচার স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্ন খুনিরা এক নিমিষে কেড়ে নিয়েছে। আমরা খুনিদের দ্রুততম সময়ে বিচার চাই। আদালতে যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ঘাতকদের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয়, সেই আশাই করছি। কোনো বয়সের আইনি ফাঁকফোকর বা অজুহাতে যেন আসামিরা পার পেয়ে না যায়।”

পুলিশের বিস্তারিত তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে অপ্রতীমকে ফুসলিয়ে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়সংলগ্ন সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা এক নির্জন বনে নিয়ে যান তুহিন। সেখানে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অপ্রতীমের হাত থেকে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সে প্রবল বাধা দেয়। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে আসামি তুহিন প্রথমে এবং পরবর্তীতে ফাহাদ ও কামরুল রূঢ়ভাবে বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় জোরে আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অপ্রতীমের করুণ মৃত্যু হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, পাহাড়ের নির্জন স্থান থেকে অপ্রতীমের নিথর মরদেহ উদ্ধারের পর আশপাশের এলাকার একাধিক সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে তার সঙ্গে শেষ মুহূর্তে থাকা তুহিনকে প্রথমে শনাক্ত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তাঁকে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে রোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। তুহিনের দেওয়া চাঞ্চল্যকর তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ফাহাদ ও কামরুলকে দ্রুত আটক করা হয়। পরবর্তীতে আসামি তুহিনের বাসায় অভিযান চালিয়ে নিহত অপ্রতীমের রক্তমাখা ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

পুলিশ আরও জানায়, শিশু অপ্রতীমের মৃত্যু পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার পর তার মোবাইল ফোনটি পকেটে পুরে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ে। এ ঘটনায় সিয়াম নামে অপর এক সহযোগী তরুণকে আটক করা হয়েছিল, যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার বিষয়ে সার্বিক তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই শেষে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ঘটনার আইনি অগ্রগতি সম্পর্কে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, “অভিযোগের গভীরতা ও বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের পরিপ্রেক্ষিতে চারজন আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা), ২০১ (আলামত গুমের চেষ্টা) ও ৩৪ (একই উদ্দেশ্যে একাধিক ব্যক্তির অপরাধ) ধারায় সরাসরি অপরাধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আমাদের তদন্তে চারজনেরই স্পষ্ট সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, যা আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।”

তিনি আরও জানান, খুব দ্রুততম সময়েই মামলাটি বিচারিক প্রসেসে গড়াচ্ছে। চার্জ গঠন ও মূল বিচার কার্যক্রম শেষে বিজ্ঞ আদালত এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।