জামালপুরে কোটি টাকার পুনঃখনন খাল ৬ মাসেই ধস
মোঃ ইমরান মাহমুদ, জামালপুর প্রতিনিধি: জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা বিপুল বাজেটে পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি খাল পুনঃখননের মাত্র ছয় মাসের মাথায় পাড় ধসে পড়েছে। এতে স্থানীয় চলাচলের রাস্তা ও শত শত বিঘা কৃষিজমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের নীতিমালাই অনুসরণ না করে মনগড়া কাজ বাস্তবায়ন করার ফলেই এই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয় ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের।
অন্যদিকে, খালের পাড়ে ধস, রাস্তা নির্মাণে অনিয়ম ও নির্ধারিত বৃক্ষরোপণ না করা সত্ত্বেও কাজের গুণগত মান ‘সঠিক’ রয়েছে এবং খালের ভেতরে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক আছে মর্মে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। শুধু তা-ই নয়, কাজের ভরা মৌসুমে ধান কাটার অজুহাতে শ্রমিক না পাওয়ার কারণ দেখিয়ে প্রকল্পের অর্ধেকেরও বেশি—অর্থাৎ ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪৯ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
উপজেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়নের পশ্চিম পলিশা মোড় থেকে দুধিয়াগাছা পর্যন্ত দীর্ঘ ৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা। সিডিউল ও প্রকল্প গাইডলাইন অনুযায়ী খালের মূল প্রস্থ ৯ দশমিক ১৬ মিটার এবং গভীরতা ৪ মিটার নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি খালের দুই পাশে সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য ৫ ফুট প্রশস্ত মজবুত মাটি ফেলে রাস্তা নির্মাণ এবং খালের স্থায়িত্বের স্বার্থে ২ হাজার ৬০টি গাছের চারা লাগানোর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল। চলতি ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই খাল পুনঃখনন, রাস্তা নির্মাণ ও বৃক্ষরোপণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
তবে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, খাল পুনঃখননের আগে যেভাবে স্বাভাবিকভাবে পানি প্রবাহিত হতো, তাতেই তারা ভালো ছিলেন। নতুন করে অপরিকল্পিতভাবে খননের পর খালের দুই পাড় প্রকাণ্ড আকারে ভেঙে কৃষিজমি ও গ্রাম্য রাস্তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য, সিডিউল অনুযায়ী শ্রমিক ও বেকু (এক্সকেভেটর) দিয়ে সমান্তরালভাবে পুনঃখনন করার কথা থাকলেও পুরো কাজটাই তাড়াহুড়ো করে শুধু বেকু দিয়ে তলার মাটি তুলে পাড়ে রেখে শেষ করা হয়েছে।
এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ টুকন মিয়া বলেন, “খালের দুই পাশে ঠিকমতো মাটি ফেলে দুরমুজ করে রাস্তা তৈরি করা হলে এভাবে পাড় ধসে পড়ত না। পাড় ধসে খালের তলদেশ আবারও ভরাট হয়ে যাচ্ছে, ফলে এখন সামান্য বৃষ্টিতেই থমকে যাচ্ছে পানির প্রবাহ।”
দুধিয়াগাছা এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মোজম্মেল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “খালের পাড় ঘেঁষা আমার দুই বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছিলাম। কিছুদিন আগেই খালটি খনন করা হয়। শ্রমিক দিয়ে খালের পাড় ভালো করে দুরমুজ করে দুই পাশে গাছের সাথে যদি ঘাস লাগানো হতো, তবে মাটির বাঁধন শক্ত হতো এবং পাড় ধসত না। কিন্তু ঠিকাদার ও তদারককারীরা এর কিছুই করেননি।”
আরেক স্থানীয় কৃষক মো. সিরাজ মিয়ার অভিযোগ, “এখানে শুধু বেকু দিয়ে খালের তলা থেকে নামমাত্র কিছু মাটি তুলে পাড়ে স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। ম্যানুয়াল লেবার বা লোকজন দিয়ে পাড়ের কোনো ফিনিশিং কাজই করা হয়নি।”
অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের সভাপতি ও আদারভিটা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রকিবুল হাসান বলেন, “এই খালটি মূলত তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথম কেটেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে পুনরায় খননকাজ শুরু হয়। পাঁচ ফুটের রাস্তা করা হলেও প্রবল ভারী বৃষ্টির কারণে কিছু কিছু অংশ ধসে পড়েছে এবং লাগানো কিছু চারাগাছ ধসে পড়ে গেছে। তবে খাল খননে এলাকার মানুষের উপকারই হয়েছে। আমাদের এই প্রকল্পের কাজগুলোর সিংহভাগ তদারকি করেছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিজান কাকা (মিজানুর রহমান রতন)।”
তবে প্রকল্পে যুক্ত থাকার অভিযোগ খণ্ডন করে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান রতন বলেন, “প্রকল্পের প্রশাসনিক ও মাঠপর্যায়ের কাজ করেছে পিআইও (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) অফিস এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ। আমি স্থানীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) নির্দেশে সাধারণ একজন নাগরিক হিসেবে শুধু তদারকি করেছি। এখানে আমার ব্যক্তিগতভাবে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।”
পুরো বিষয়টির ব্যাখায় মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী বলেন, “খালটি নতুন নয়, আগের বিদ্যমান খালকেই পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে সরকারি নির্দেশনা মেনে পুনঃখনন করা হয়েছে। এই অঞ্চলের মাটি মূলত বালুপ্রধান। ফলে ভারী বৃষ্টির পানিতে বালুমাটি ধুয়ে খালের পাড় কিছুটা ধসে গেছে এবং কিছু গাছ পড়ে গেছে। তবে আমাদের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম এখনো চালু রয়েছে।”
তিনি আরও আশ্বাস দেন, “যেসব জায়গায় পাড় ধসে গেছে, সেগুলো সংস্কারে আমরা এডিপি (ADP) এবং এলজিইডির (LGED) মেরামত প্রকল্পের আওতায় তালিকাভুক্ত করেছি। আশা করছি খুব দ্রুতই জনগণের এই দুর্ভোগ লাঘব হবে।”
উল্লেখ্য, সিডিউল অনুযায়ী সম্পূর্ণ কাজ শেষ না করে ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকটের দোহাই দিয়ে প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত ১ কোটি ২৮ লাখ টাকার মধ্যে ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪৯ টাকা অব্যবহৃত দেখিয়ে সরকারি কোষাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যা নিয়ে পুরো এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।