শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১২ একর বনভূমি দখলের অভিযোগ
সুমন ঘোষ, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: টাঙ্গাইলের সখীপুরে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ ওরফে বাবুলের বিরুদ্ধে বন বিভাগের প্রায় ১২ একর জমি দখল করে মাল্টা বাগান, গরুর খামার ও ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষকদের বদলি ও পদায়নে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনেরও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, সখীপুর উপজেলার ধলিপাড়া এলাকায় নূর মোহাম্মদের পরিবারের দখলে থাকা বন বিভাগের জমিতে গড়ে উঠেছে মাল্টা বাগান, গরুর খামার ও একটি ডুপ্লেক্স ভবন। স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, ওই এলাকায় আগে শাল ও গজারি গাছ ছিল। পরে সেসব গাছ কেটে জমি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নূর মোহাম্মদের মাল্টা বাগানটি স্থানীয় সাইফুল ইসলাম লিজ নিয়ে পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে। সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আটিয়া বন অধ্যাদেশের কারণে জমির কাগজপত্রে জটিলতা রয়েছে। এ কারণে ভূমি অফিস খাজনা নিচ্ছে না। একই কারণে ব্যাংক থেকেও ওই জমির বিপরীতে ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি বনভূমির দখল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে জানতে নূর মোহাম্মদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁকে এলাকায় পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে শিক্ষা প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে শিক্ষকদের বদলি, পদায়ন ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়ম ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে পছন্দের শিক্ষককে পদায়ন কিংবা বদলি করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেন করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষা প্রশাসনের একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই চক্রের সঙ্গে পাবনা সদর উপজেলার সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিদা শবনমের ঘনিষ্ঠতার কথাও বলা হচ্ছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ বা কোনো মামলার তথ্য এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে তাঁর সরকারি চাকরির আয়-উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজধানী ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সখীপুর পৌর এলাকায় তাঁর একাধিক বাড়ি, ডুপ্লেক্স ও ফ্ল্যাট রয়েছে। পাশাপাশি দামি গাড়ি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল অর্থ থাকার কথাও বলা হচ্ছে।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস এবং তাঁর আয়কর নথিতে সম্পদ ঘোষণার বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে নূর মোহাম্মদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
নূর মোহাম্মদ ও শাহিদা শবনমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও বিত্তবান ব্যক্তিকে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন। তাঁদের দাবি, ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে হেয় করার ভয় দেখিয়ে পরে অর্থ নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো মামলার নথি বা আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারীদের কয়েকজন বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
অভিযোগকারীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর তদন্ত না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তাঁরা নূর মোহাম্মদের সম্পদ, বনভূমি দখল এবং শিক্ষা প্রশাসনে অনিয়মের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
কালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জামাল মিয়া বলেন, ‘নূর মোহাম্মদ নামে নয়, এলাকায় তিনি বাবুল নামে পরিচিত। মানুষ হিসেবে তাঁকে ভালো বলেই জানি। তবে বনের জমি দখলের বিষয়টি আমার জানা নেই।’ তিনি বলেন, ‘আটিয়া বন অধ্যাদেশের কারণে এ এলাকার অনেকেই জমির খাজনা-খারিজ (নামজারি) করতে পারছেন না।’
টাঙ্গাইলের সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব বলেন, ‘বনের জায়গা জবরদখল করার এখতিয়ার কারও নেই। যদি জবরদখলের কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে নূর মোহাম্মদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বনভূমি দখল, সম্পদের উৎস এবং শিক্ষা প্রশাসনে অনিয়মের অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিপত্র যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
এআইএল/সকালবেলা