বাগেরহাটে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগ
মাসুম বিল্লাহ, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি: রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্র গ্রহণ না করা, প্রেসক্রিপশনে ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট ছুড়ে ফেলা এবং চরম অসৌজন্যমূলক আচরণের এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বাগেরহাট শহরের এক নাক-কান-গলা (ইএনটি) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, রোগীর স্বজনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং তাঁর বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য জানতে চেম্বারে যাওয়ায় এক পেশাদার সংবাদকর্মীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, মারধরের চেষ্টা এবং সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে।
উক্ত ঘটনার জেরে ভুক্তভোগী সাংবাদিক বাদি হয়ে বাগেরহাট সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্য মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হওয়ায় সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অভিযুক্ত চিকিৎসকের নাম ডা. শেখ ইফতেখারুল আলম। তিনি বাগেরহাট শহরের দশানী এলাকার নিজ বাসভবনে ব্যক্তিগত চেম্বার পরিচালনা করেন। তাঁর ব্যবহৃত বিভিন্ন সাইনবোর্ড ও ভিজিটিং কার্ডে নাক-কান-গলা (ইএনটি) এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে অভিজ্ঞতা থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। কার্ডে তাঁর ডিগ্রির ঘরে এমবিবিএস, পিজিটি (ইএনটি), সিসিডি (বারডেম) এবং এমসিজিপি (মেডিসিন) উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অন্য আরেকটি কার্ডে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অভিজ্ঞতা এবং বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নম্বর হিসেবে 'এ-১১৪১৭৮' উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর এসব শিক্ষাগত ডিগ্রি, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও পেশাগত পরিচয় এবং নিবন্ধন সঠিক কি না—তা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহল ও জনপ্রতিনিধিরা গভীর সন্দেহ প্রকাশ করে নিরপেক্ষ যাচাইয়ের জোরালো দাবি তুলেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধা রোগী আলেয়া বেগমের একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে। ভুক্তভোগী আলেয়া বেগম জানান, তিনি কানের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার উন্নত চিকিৎসার জন্য ডা. শেখ ইফতেখারুল আলমের কাছে গেলে চিকিৎসক তাঁকে কিছু ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে তিনি ‘হেলথ এইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ থেকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে চিকিৎসকের চেম্বারে হাজির হন। কিন্তু রিপোর্টটি দেখামাত্রই চিকিৎসক সেটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে রোগীর সামনেই রিপোর্টটি টেবিল থেকে সজোড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তাঁকে অন্য একটি নির্দিষ্ট ল্যাব বা সিটি ল্যাব থেকে পুনরায় পরীক্ষা করিয়ে আনতে নির্দেশ দেন।
অন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্ট হওয়ার কারণেই মূলত চিকিৎসক সেটি দেখতে চাননি বলে ভুক্তভোগী রোগী ও তাঁর স্বজনদের জোরালো অভিযোগ। যদিও পরীক্ষার মান বা চিকিৎসাগত গ্রহণযোগ্যতার কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে এই দুর্ব্যবহারের খবর পেয়ে 'এশিয়া পোস্ট অনলাইন নিউজ' ও 'দৈনিক আগামীর সময়'-এর বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি এবং সাংবাদিক শেখ সোহেল (৩০) পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে চিকিৎসকের বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যক্তিগত চেম্বারে যান। কিন্তু চেম্বারে পা রাখামাত্রই সাংবাদিকের সঙ্গে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়।
সাংবাদিক শেখ সোহেল জানান, “একজন সংবাদকর্মী হিসেবে রোগীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে তথ্য ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বক্তব্য জানতে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু চিকিৎসক ও তাঁর সহযোগীরা আমার ওপর চড়াও হন। আমাকে অকথ্য ভাষায় হেনস্তা করা হয় এবং সংবাদ প্রকাশ করলে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।”
এই ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিকার চেয়ে এবং নিজের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাংবাদিক শেখ সোহেল গত ২১ অক্টোবর বিকেলে বাগেরহাট সদর থানায় ডা. শেখ ইফতেখারুল আলমের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগে ডা. শেখ ইফতেখারুল আলম বাগেরহাট শহরের মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের লঞ্চঘাট সংলগ্ন ‘হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এ চেম্বার করতেন। সেখানকার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, চিকিৎসক হিসেবে তাঁর সঠিক যোগ্যতা নিয়ে মানুষের মনে নানা সংশয় রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের এক দোকানদার জানান, তাঁর চেম্বারে অহরহ রোগী আসলেও চিকিৎসকের রুক্ষ ও দুর্ব্যবহার নিয়ে অনেক রোগীকে আড়ালে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তাঁর সনদ ও ডিগ্রিগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি।
হেলথ এইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী এস এম নুরুল আলম লিটন জানান, ঘটনার দিন চিকিৎসক তাঁকে আকস্মিক ফোন করে সাংবাদিক পাঠিয়ে চেম্বারে ‘মব’ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ তোলেন। লিটন বলেন, “আমি তাঁকে শান্তভাবে সমস্যা জানতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি উল্টো আমার সঙ্গে অত্যন্ত বাজে ভাষায় কথা বলেন। একজন দায়িত্বশীল চিকিৎসকের মুখ থেকে এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। রোগীর সুবিধার্থে চিকিৎসকের পছন্দের ল্যাব থাকতে পারে, কিন্তু রোগীর সামনে রিপোর্ট ছুড়ে ফেলা চরম অমানবিক।” যদিও পরবর্তীতে চিকিৎসক তাঁকে ফোন করে ক্ষমা চেয়েছেন বলে জানান তিনি।
অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. শেখ ইফতেখারুল আলমের ব্যক্তিগত সহযোগী আদনান জানান, সাংবাদিকেরা তথ্য জানতে গেলে চিকিৎসক উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন এবং চেম্বার থেকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে অন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিপোর্ট গ্রহণ না করার কারণ এবং সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকির মতো গুরুতর বিষয়ে ডা. ইফতেখারুল আলমের সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সার্বিক বিষয়ে বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আ. স. মো. মাহবুবুল আলম গণমাধ্যমকে জানান, “একজন চিকিৎসকের আচরণ এবং সেবা প্রদান নিয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমাদের হাতে এসেছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
মামলা ও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বাগেরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সামসুল আরেফিন জানান, “সাংবাদিককে হুমকি ও হেনস্তার ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়া মাত্রই আইন অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”