সাতক্ষীরা থেকে: দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়নের রূপকার, প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও সাতক্ষীরা সদর আসনের তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শামসুর রহমানের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। এই উপলক্ষে সম্প্রতি মরহুমের কবর জিয়ারত ও তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় তাঁর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের জামায়াত নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারি সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুরে জন্মগ্রহণ করা এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ২০০৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জেলা সমিতি, বৃহত্তর খুলনা সমিতি ও সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতসহ পারিবারিকভাবে মিলাদ মাহফিল, কুরআনখানি ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
কাজী শামসুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক বিশেষ নিবন্ধে সাতক্ষীরা সদর-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক বলেন, সাতক্ষীরায় ইসলামি আন্দোলনের গণভিত্তি রচনা করেছিলেন কাজী শামসুর রহমান। তিনি ছিলেন অত্যন্ত গতিশীল ও কর্মঠ মানুষ। ১৯৮৬ সালে প্রথম এমপি হওয়ার পূর্বে তিনি বেশির ভাগ সময় বাইসাইকেলে চড়ে সাংগঠনিক সফর করতেন। পোশাক-পরিচ্ছদ, জরুরি ওষুধ, মোমবাতি ও সংগঠনের নথিপত্র সবসময় একটি ব্যাগে সাথে রাখতেন। তিনি জেলায় আন্দোলনের অগ্রগতির জন্য মুহাঃ ইজ্জত উল্লাহ, ডা. নুরুল আমীন ও মৌলভী আব্দুল জালীদ সাহেবের মতো যোগ্য সংগঠকদের খুঁজে বের করেছিলেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি এতটাই পরহেজগার ছিলেন যে, এক অজুতে কয়েক ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন এবং নিয়মিত শেষ রাতে তাহাজ্জুদ ও জিকির-আজকারে মগ্ন থাকতেন। তাঁর চরিত্র ছিল দিনের বেলায় ঘোড়সওয়ার ও রাতের জায়নামাজের দরবেশের মতো।
কাজী শামসুর রহমান তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ১৯৮৬, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে সাতক্ষীরা সদর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংসদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ত্রাণ ও কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সাফল্যের পরিচয় দেন। জাতীয় সংসদে আজান ও নামাজের ব্যবস্থা করা, সাতক্ষীরায় ২৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ, স্বল্প খরচে সমুদ্রপথে হজ পালন এবং সাতক্ষীরা আলিয়া মাদ্রাসা সরকারীকরণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়া সেনাবাহিনী ও পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীতে নামাজের সময় নির্দিষ্টকরণ এবং নারীদের ময়নাতদন্তে নারী ডাক্তার নিয়োগের প্রস্তাবও তিনি সংসদে পেশ করেছিলেন। সাতক্ষীরার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কালিগঞ্জ ও আশাশুনি ব্রিজ নির্মাণ এবং নাভারণ থেকে সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট পর্যন্ত বিশাল হাইওয়ে নির্মাণের প্রস্তাবেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনবার এমপি থাকলেও তাঁর সততা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ছিল প্রশ্নাতীত, এমনকি ঘোরতর শত্রুও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলার সাহস পায়নি।
মরহুম কাজী শামসুর রহমানকে নিয়ে সাতক্ষীরায় একটি অলৌকিক স্মৃতি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। দ্বিতীয়বার এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর এক রাতে তাঁর বিরোধী পক্ষের কিছু লোক প্রতিহিংসাবশত তাঁর বাড়িতে আগুন দেওয়ার পরিকল্পনা করে। তারা কয়েকবার কেরোসিন ও লাইটার দিয়ে খড়ের ঘরে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেও রহস্যজনকভাবে ব্যর্থ হয়। পরে তারা জানলা দিয়ে দেখতে পায়, গভীর রাতে নতুন এমপি সাহেব না ঘুমিয়ে একা মনে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করছেন। এই দৃশ্য দেখে হামলাকারীরা লজ্জিত হয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। এই ঘটনার পর থেকেই এলাকায় তাঁর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা কিংবদন্তিতে রূপ নেয়। দক্ষিণবঙ্গের মানুষ আজও তাঁর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ধর্মীয় নিষ্ঠার কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।