অতিরিক্ত পানি পান করলে কি ডায়রিয়া হতে পারে

প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০২:২৪ অপরাহ্ণ
অতিরিক্ত পানি পান করলে কি ডায়রিয়া হতে পারে

লাইফস্টাইল ডেস্ক:সুস্থ ও পরিপাটি জীবনযাপনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখা। পানি আমাদের বিপাকক্রিয়া সচল রাখে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং ত্বককে রাখে উজ্জ্বল ও সতেজ। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, স্বাস্থ্য সচেতনতা দেখাতে গিয়ে অনেকেই প্রতিদিন লিটার কে লিটার পানি একবারে পান করে ফেলেন এবং পরবর্তীতে পেটের গোলমাল বা নরম মলের মতো সমস্যায় ভুগে ভাবতে শুরু করেন যে, অতিরিক্ত পানি পানের কারণেই হয়তো তাঁদের ডায়রিয়া হয়েছে। এই ধারণাটি পুরোপুরি সত্য নয়, তবে এর পেছনে চমৎকার কিছু শারীরিক ও বৈজ্ঞানিক মেকানিজম কাজ করে, যা প্রত্যেকেরই জেনে রাখা জরুরি।

আজ বুধবার (১০ জুন) অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘লাইফস্টাইল, ফ্যাশন, রূপচর্চা ও দৈনিক রুটিন’ এবং ‘স্বাস্থ্যসেবা, জননিরাপত্তা, মহামারি ও চিকিৎসা ট্র্যাকিং উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে অতিরিক্ত পানি পানের প্রভাব ও শরীর আর্দ্র রাখার সঠিক খতিয়ান তুলে ধরা হলো।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রশ্নের সরাসরি ও সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো না। কেবল বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন পানি পান করার কারণে কোনো সুস্থ মানুষের শরীরে সাধারণত ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা সৃষ্টি হয় না। মানুষের পরিপাকতন্ত্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে যেকোনো তরল উপাদানকে শরীরে শোষণ এবং প্রক্রিয়াজাত করার জন্য প্রাকৃতিকভাবে তৈরি। পাশাপাশি, শরীরে যদি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পানি চলেও যায়, তবে সুস্থ কিডনি (বৃক্ক) প্রস্রাবের মাধ্যমে সেই অতিরিক্ত পানি শরীর থেকে অত্যন্ত সহজে বের করে দিতে সাহায্য করে। ফলে, বেশিরভাগ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য সারাদিন ধরে পর্যাপ্ত পানি পান করলে হজমের কোনো সমস্যাই হওয়ার কথা নয়।

বিষয়টি তখনই কিছুটা জটিল রূপ নেয়, যখন কেউ অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে খুব বেশি পরিমাণে পানি পান করে ফেলেন। শরীর যদি একবারে বা এক চুমুকে অস্বাভাবিক পরিমাণে তরল গ্রহণ করে, তবে তা অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও গতিকে সাময়িকভাবে ব্যাহত করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে খাদ্য ও তরল উপাদানের চলাচল বা ট্রানজিট টাইম স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত হয়ে যায়। কোলন বা বৃহদন্ত্র তখন অতিরিক্ত পানি পুরোপুরি শোষণ করার পর্যাপ্ত সময় পায় না, যার ফলে মাঝে মাঝে মল কিছুটা নরম বা পাতলা হতে পারে। তবে চিকিৎসকদের মতে, এটি কোনো রোগ বা দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া নয়; এটি অত্যন্ত মৃদু এবং সাময়িক একটি শারীরিক প্রতিক্রিয়া মাত্র, যা খুব দ্রুত পানি না খেলে সাধারণত কারোরই হয় না।

খুব বিরল ও ব্যতিক্রমী কিছু ক্ষেত্রে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত এবং অতি দ্রুত পানি পান করার ফলে শরীরে ‘ওয়াটার ইনটক্সিকেশন’ (Water Intoxication) বা হাইপোনাট্রেমিয়া (Hyponatremia) নামক এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এই অবস্থায় অতিরিক্ত পানির কারণে রক্তে থাকা অতি প্রয়োজনীয় খনিজ বা সোডিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যায়। সোডিয়ামের এই মারাত্মক ঘাটতির ফলে কোষে পানি জমে যায়, যা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। যদিও সাধারণ জীবনযাত্রায় এটি অত্যন্ত বিরল এবং কেবল চরম ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই অলিম্পিক অ্যাথলেট বা অতিরিক্ত পরিশ্রমীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তাই সুস্বাস্থ্যের জন্য পানি পানের ক্ষেত্রে ‘ভারসাম্য’ বজায় রাখার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন। পানি পানের সঠিক নিয়মগুলো হলো:

একবারে পুরো এক বোতল বা গ্লাস ভর্তি পানি গপগপিয়ে না খেয়ে, সারাদিন ধরে অল্প অল্প করে চুমুক দিয়ে পানি পান করুন। তৃষ্ণা অনুযায়ী এবং নিজের শরীরের গঠন ও আবহাওয়া বিবেচনা করে পানি পান করুন। অতিরিক্ত জোরাজুরি করে পানি পানের প্রয়োজন নেই। আপনি যে পানি পান করছেন, তা ফুটিয়ে বা ফিল্টার করে শতভাগ জীবাণুমুক্ত ও বিশুদ্ধ কিনা, তা নিশ্চিত করুন। কারণ অনেক সময় পানির পরিমাণের চেয়ে পানির গুণগত মান বা দূষিত পানির ব্যাকটেরিয়াই ডায়রিয়ার আসল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পরিশেষে বলা যায়, বেশি পানি পান করা কোনো অপরাধ বা ডায়রিয়ার সরাসরি কারণ নয়; বরং আপনি কীভাবে এবং কত সময়ে তা পান করছেন সেটাই মূল বিষয়। সঠিক নিয়মে পানি পানের অভ্যাসই আপনাকে দেবে সুস্থ হজমশক্তি ও দীর্ঘায়ু।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন