ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টা যেভাবে পাল্টে দিল তুরস্ককে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: রাস্তায় সাঁজোয়া ট্যাংকের মহড়া, মাথার ওপর যুদ্ধবিমানের গর্জন আর খোদ সংসদ ভবনে একের পর এক বোমা হামলা—২০১৬ সালের ১৫ জুলাই এমন এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ রাতের সাক্ষী হয়েছিল তুরস্ক। তবে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের একটিমাত্র ভিডিও কলে সাড়া দিয়ে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই সামরিক অভ্যুত্থানচেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়। রক্তাক্ত ওই রাতে ২৫৩ জন প্রাণ হারান। মাত্র কয়েক ঘণ্টার সেই ঘটনা গত এক দশকে তুরস্কের রাজনীতি, অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা এবং পররাষ্ট্রনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছে।
তুর্কি সরকারের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ইসলামপন্থি ধর্মগুরু ফেতুল্লাহ গুলেনের নেটওয়ার্ক এই অভ্যুত্থানের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছিল। যদিও ২০২৪ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত গুলেন এই অভিযোগ অস্বীকার করে গেছেন। ওই ঘটনার পর দেশটিতে টানা দুই বছর জরুরি অবস্থা জারি থাকে। এই সময়ে গুলেন নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে হাজার হাজার সেনাসদস্য, বিচারক, পুলিশ, শিক্ষাবিদ ও সরকারি কর্মচারীকে গ্রেফতার বা বরখাস্ত করা হয়, যা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শুদ্ধি অভিযান। তবে সমালোচকদের দাবি, এই অভিযানের আড়ালে মূলত ভিন্নমত ও বিরোধীদের স্তব্ধ করা হয়েছে।
ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রভাব ছিল ২০১৭ সালের সংবিধান সংশোধন। এক গণভোটের মাধ্যমে তুরস্কের দীর্ঘদিনের সংসদীয় ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে শক্তিশালী ‘নির্বাহী রাষ্ট্রপতিশাসিত’ ব্যবস্থা চালু করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে সব ক্ষমতা এককভাবে প্রেসিডেন্টের হাতে ন্যস্ত করা হয়। এরদোয়ান সমর্থকদের মতে, এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এনেছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, এর ফলে তুরস্কের বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ধূলিসাৎ হয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে তুরস্কের অবস্থান এখন ১৬৩তম। এমনকি সম্প্রতি প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি-এর নেতৃত্বে আদালতের হস্তক্ষেপকে বিরোধীরা ‘বিচারিক অভ্যুত্থান’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তুর্কি রাজনীতিতে এই ঘটনার অন্যতম বড় ইতিবাচক দিক হলো সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক তথা জনগণের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীকে শক্ত হাতে সরকারের অধীনে আনা হয়েছে। আধুনিক তুর্কি ইতিহাসে এবারই প্রথম জনগণ সরাসরি বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা দেশটির রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের চিরতরে অবসান ঘটায়।
ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে উত্তর সিরিয়ায় কুর্দি গোষ্ঠী ও আইএস দমনে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালায় আঙ্কারা। একই সঙ্গে ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে এবং রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা 'এস-৪০০' কেনে। এর জেরে ওয়াশিংটন তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দেয়। তবে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগ দেওয়ার বিষয়ে তুরস্কের আলোচনা বর্তমানে পুরোপুরি স্থগিত রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এআইএল/সকালবেলা
|