গাজীপুরে চলছে লাইসেন্সবিহীন মেডিকেল সেবা
রেজাউল করিম মজুমদার, গাজীপুর: গাজীপুর জেলা জুড়ে লাইসেন্সবিহীন ও অনুমোদনহীন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করা এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসন নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলেও এই বেপরোয়া সাম্রাজ্য পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছাড়াই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে কেবল মৌখিক বা নামে মাত্র অনুমোদনে বছরের পর বছর কার্যক্রম পরিচালনা করছে শত শত প্রতিষ্ঠান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাজীপুর সদরের পাশাপাশি কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন উপজেলায় ভুঁইফোড় হাসপাতালগুলোর দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে গাজীপুরের প্রধান সরকারি হাসপাতাল ‘শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ’ এবং টঙ্গী সরকারি হাসপাতালের আশেপাশের এলাকাগুলোতে লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক বিশাল চক্র গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারি হাসপাতালের দালালদের মাধ্যমে রোগীদের ভাগিয়ে নিয়ে অপচিকিৎসা ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সম্প্রতি গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা— যেমন জয়দেবপুর, শ্রীপুর, চৌরাস্তা, সালনা, কোনাবাড়ী, বোর্ড বাজার, কাশিমপুর, মাওনা, কালিয়াকৈর, টঙ্গী এবং সফিপুরে র্যাব ও জেলা প্রশাসনের নিয়মিত অভিযানে অনেক অবৈধ প্রতিষ্ঠানের সন্ধান মিলেছে। এসব অভিযানে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, ত্রুটিপূর্ণ ল্যাব এবং অন্যের ডিগ্রি ব্যবহারকারী ভুয়া চিকিৎসকদের হাতেনাতে ধরে কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের জরিমানা করা হচ্ছে। এছাড়া লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকা ও নানা অনিয়মের দায়ে অসংখ্য নামী-দামি হাসপাতাল সিলগালা করা হয়েছে।
পূর্বে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে স্বয়ং সাবেক এক মন্ত্রীর মালিকানাধীন সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো বড় প্রতিষ্ঠানও ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানার সম্মুখীন হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অভিযানে অনিয়ম ও লাইসেন্স জটিলতায় বন্ধ বা জরিমানার আওতায় আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে— চৌরাস্তা মডার্ন হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সেবা জেনারেল হসপিটাল, সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ডিজিটাল জেনারেল হসপিটাল, কোনাবাড়ীর তাজমহল জেনারেল হসপিটাল, কোনাবাড়ী পপুলার হসপিটাল, কোনাবাড়ী ইউনাইটেড হাসপাতাল, কোনাবাড়ী ল্যাবএইড হসপিটাল, নাওজোর জেনারেল হাসপাতাল, আশা জেনারেল হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, তাকওয়া জেনারেল হাসপাতাল, রয়েল হাসপাতাল লিমিটেড, প্রফেসর শিরাজুল হক জেনারেল হসপিটাল, রাহাতুন্নেছা জেনারেল হাসপাতাল, কাশিমপুরের জিরানী বাজারের সাইন্সল্যাব হাসপাতাল এবং কালিয়াকৈরের চন্দ্রা এলাকার স্কয়ার হাসপাতাল, মাইশা জেনারেল হাসপাতাল, সেবা শুশ্রূষা হাসপাতাল, ফাতেমা জেনারেল হাসপাতাল, নিউ লাইফ হাসপাতাল অ্যান্ড ট্রমা সেন্টার, সুফিয়া হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্স, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, দেওয়ান ডিজিটাল হাসপাতাল, জাহানারা শিশু হাসপাতাল, রাবিয়া সকিনা ক্লিনিক, ড. ফরিদা হক মেমোরিয়াল, ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল এবং মাওনা চৌরাস্তার লাইফ কেয়ার হাসপাতাল।
অভিযানে দেখা গেছে, জেলাটিতে এমন অনেক হাতুড়ে ও ভুয়া চিকিৎসক রয়েছে, যারা নিজেদের এমবিবিএস বা বিশেষ কোনো রোগের বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিয়ে সাধারণ রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। অন্যের বিএমডিসি (BMDC) সনদ ও জাল ডিগ্রি ব্যবহার করার অপরাধে এদের অনেককেই হাতেনাতে ধরে জেল ও জরিমানার শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, "আমরা নিয়মিত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে মিটিং করছি এবং সতর্ক বার্তা দিচ্ছি। নিয়মতান্ত্রিকভাবে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা ও সিলগালা করা হচ্ছে। জনস্বার্থ রক্ষায় আমাদের এই কঠোর অভিযান সবসময় অব্যাহত থাকবে।"
জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে যেকোনো বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিএমডিসি-এর নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা এবং চিকিৎসকের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এআইএল/সকালবেলা
|