ইউটিউবে এআই ভিডিওতে যুক্ত হবে বিশেষ লেবেল
তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক : বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে (YouTube) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) দিয়ে তৈরি ভিডিওর সংখ্যা দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এর মধ্যে বর্তমান সময়ে তৈরি অনেক এআই ভিডিও ও ডিপফেক কন্টেন্ট এতটাই নিখুঁত ও বাস্তবধর্মী হচ্ছে যে, সাধারণ খালি চোখে দেখে সাধারণ দর্শকদের পক্ষে তা এআই নাকি আসল তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেটে এমন বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে দর্শকদের প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাতে এক যুগান্তকারী ও কঠোর নতুন উদ্যোগ নিয়েছে টেক জায়ান্ট ইউটিউব।
আজ সোমবার (১ জুন) সকাল ১০টা ৩১ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘তথ্যপ্রযুক্তি’ বিভাগের এক বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ইউটিউবের এই নতুন লেবেলিং পলিসি ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ইউটিউব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন থেকে এআই দিয়ে তৈরি কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আংশিক বা পূর্ণ পরিবর্তন করা যেকোনো ভিডিওতে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্টভাবে ও দৃশ্যমান উপায়ে বিশেষ সতর্কতামূলক ‘লেবেল’ প্রদর্শন করবে প্ল্যাটফর্মটি। নতুন এই নিয়মে ইউটিউব আর শুধুমাত্র কনটেন্ট নির্মাতার বা ক্রিয়েটরের দেওয়া তথ্যের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করে বসে থাকবে না। প্রয়োজনে ইউটিউব নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদম ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও বিশ্লেষণ বা স্ক্যান করবে এবং এআই ব্যবহারের বিষয়টি নিজে থেকেই শনাক্ত করে নেবে।
এর আগে ইউটিউবের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ভিডিও তৈরিতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে নির্মাতাদের সেটি আপলোডের সময় নিজ দায়িত্বে উল্লেখ করতে হতো। এরপর সেই ভিডিওর ডেসক্রিপশন বা বিবরণ অংশে ছোট করে একটি লেবেল যুক্ত করা হতো, যা সাধারণ দর্শকদের চোখ এড়িয়ে যেত। কিন্তু নতুন উন্নত ব্যবস্থায় সেই লেবেলটিকে আরও দৃশ্যমান স্থানে নিয়ে আসা হচ্ছে। ইউটিউব জানিয়েছে, এখন থেকে ভিডিওর মূল শিরোনাম বা টাইটেলের ঠিক নিচেই অথবা শিরোনামের কাছেই এআই সম্পর্কিত এই বিশেষ সতর্কবার্তা দেখা যাবে। এছাড়া বর্তমানের জনপ্রিয় কন্টেন্ট মাধ্যম ‘ইউটিউব শর্টস’ (YouTube Shorts)-এর ক্ষেত্রেও ভিডিও স্ক্রিনের নিচের অংশে স্পষ্টভাবে এই লেবেল প্রদর্শন করা হবে।
নতুন এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হলো এর ‘স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ প্রযুক্তি’ (Automated Detection Technology)। কোনো কন্টেন্ট ক্রিয়েটর যদি ভিউ পাওয়ার আশায় বা চালাকি করে এআই ব্যবহারের তথ্য গোপন করেন বা না দেন, তবুও ইউটিউব ব্যাকএন্ডে পুরো ভিডিওটি ডিজিটাল স্ক্যান করবে। যদি মেটাডাটা বা ভিজ্যুয়াল অ্যানালাইসিসে দেখা যায় যে ভিডিওতে উল্লেখযোগ্যভাবে বাস্তব মানুষের চেহারা বা কণ্ঠস্বর পরিবর্তনে এআই ব্যবহার করা হয়েছে, তবে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই ভিডিওতে লেবেল সেঁটে দেবে।
তবে এই নতুন নিয়মে সৎ ক্রিয়েটরদের ভয়ের কিছু নেই বলে আশ্বস্ত করেছে গুগল মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি। ইউটিউব স্পষ্ট জানিয়েছে, ভিডিওতে এআই লেবেল যুক্ত হওয়া মানেই কিন্তু সেই ভিডিওর মনিটাইজেশন বা বিজ্ঞাপনের আয় কমে যাওয়া নয়। এমনকি ইউটিউবের মূল অ্যালগরিদমের প্রচার, ইমপ্রেশন কিংবা দর্শকদের হোম পেজে ভিডিওর সুপারিশ (Recommendation) ব্যবস্থাতেও এই লেবেলের কারণে কোনো প্রকার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। ইউটিউবের ভাষায়, “ভিডিওর রিচ কমানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়, বরং দর্শকদের স্ক্রিনে সঠিক ও স্বচ্ছ তথ্য জানানোই আমাদের একমাত্র মূল লক্ষ্য।”
গত কয়েক বছরে ইউটিউবে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি মহলে তথাকথিত ‘এআই স্লপ’ (AI Slop) নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় ভিডিওগুলোতে প্রায়ই ভুল তথ্য, ঐতিহাসিক বিভ্রান্তিকর ছবি কিংবা অত্যন্ত নিম্নমানের কন্টেন্ট দেখা যায়, যা ইন্টারনেটের পরিবেশ নষ্ট করছে। এই কারণে ইতিমধ্যে লাখো ভিডিও এবং অসংখ্য ফেক চ্যানেলের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে ইউটিউব। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) নীল মোহন এআই–নির্ভর এই নিম্নমানের ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট কমানোকে চলতি বছরে তাঁর অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে ইউটিউবের এই নতুন প্রশংসনীয় সুবিধাটি আপাতত শুধু মূল ইউটিউব অ্যাপ ও প্ল্যাটফর্মেই পাওয়া যাবে। শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি সুরক্ষিত প্ল্যাটফর্ম ‘ইউটিউব কিডস’ (YouTube Kids)-এ এখনো এই লেবেলিং ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে না। আর ইউটিউবের এই দ্বিমুখী সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিমধ্যেই তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব শিশু অধিকারবিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন। তাদের দাবি, শিশুদের জন্য তৈরি অনেক এআই কার্টুন বা ভিডিও অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। তাই বড়দের মতো ইউটিউব কিডসেও অবিলম্বে স্পষ্ট লেবেল থাকা প্রয়োজন। এই বিতর্কের জবাবে ইউটিউব জানিয়েছে, শিশুদের প্ল্যাটফর্মের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্রযুক্তিগত সমাধান নিয়ে তাদের টিম কাজ করছে। তবে তা কবে নাগাদ বিশ্বব্যাপী চালু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনো জানানো হয়নি।
উল্লেখ্য, সব ধরনের এআই ভিডিও কিন্তু এই কঠোর ব্যবস্থার আওতায় আসবে না। মূলত বাস্তব মানুষের মতো দেখতে কিংবা কোনো বাস্তব ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক ঘটনার মতো মনে হয়— এমন বিভ্রান্তিকর এআই-তৈরি ভিডিওগুলোই নিখুঁতভাবে শনাক্ত করবে ইউটিউব। অন্যদিকে সাধারণ ডিজিটাল কার্টুন, কাল্পনিক থ্রিডি অ্যানিমেশন কিংবা অতিরিক্ত শৈল্পিক বা সায়েন্স ফিকশন ভিডিওগুলো আপাতত এই বাধ্যতামূলক লেবেলিং ব্যবস্থার বাইরেই থাকছে।
আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ডিপফেক (Deepfake) ও আইনি ভুয়া তথ্যের ঝুঁকি যেভাবে দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, সেই সংকটময় সময়ে ইউটিউবের এই সময়োপযোগী উদ্যোগ সাধারণ দর্শকদের জন্য বাড়তি অনলাইন স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তবে শিশুদের প্ল্যাটফর্মে একই ধরনের পূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু না হওয়া পর্যন্ত এই বৈশ্বিক বিতর্ক পুরোপুরি থামবে না।
জান্নাত সকালবেলা
|