উপযোগী অঞ্চলেই পাট চাষ, অনুপযোগী এলাকায় নয়
অনক আলী হোসেন শাহিদী: বাংলাদেশে পাট চাষ ও পাটবীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব অঞ্চলে পাট চাষের ঐতিহ্য রয়েছে, কৃষকের আগ্রহ আছে, মাটি ও পরিবেশ উপযোগী এবং পাট পচানোর জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রয়েছে—সেসব এলাকায় পাট চাষ সম্প্রসারণ করা উচিত। তবে যেসব অঞ্চলে পাট চাষের জন্য ভৌগোলিক ও পরিবেশগত উপযোগিতা নেই এবং কৃষকের আগ্রহও কম, সেসব এলাকায় জোর করে পাট চাষ সম্প্রসারণ করা ঠিক হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাটে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের অর্থ দেশের প্রতিটি অঞ্চলে পাট চাষ করা নয়; বরং সম্ভাবনাময় ও উপযোগী এলাকায় উৎপাদন বাড়িয়ে পাট ও পাটবীজের চাহিদা পূরণ করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
পাট বাংলাদেশের শত বছরের ঐতিহ্য ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। বর্ষাকালীন এ ফসলের জীবনকাল সাধারণত ১০০ থেকে ১২০ দিন। বাংলাদেশে পাট ‘সোনালী আঁশ’ হিসেবে পরিচিত। উৎকৃষ্ট মানের পাট উৎপাদনের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের পাটের বিশেষ সুনাম রয়েছে।
দেশে প্রধানত দুই ধরনের পাট উৎপাদিত হয়—সাদা পাট ও তোষা পাট। সরকার পাটকে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। দেশের প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৮ লাখ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়। বিশ্বে চাহিদাকৃত পাটের প্রায় ২৪ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত পাটের প্রায় ৫১ শতাংশ দেশের পাটকলগুলোতে ব্যবহৃত হয়, ৪৪ শতাংশ রপ্তানি হয় এবং প্রায় ৫ শতাংশ দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে যায়।
সম্ভাবনাময় অঞ্চলেই বেশি গুরুত্ব
বাংলাদেশের সব অঞ্চলে পাট চাষের সম্ভাবনা এক নয়। কোথাও দীর্ঘদিনের পাট চাষের ঐতিহ্য, উর্বর মাটি, পর্যাপ্ত পানি এবং কৃষকের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। এসব এলাকাকে পাট উৎপাদনের প্রধান অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে উৎপাদন ও পাটবীজ সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
দেশে সবচেয়ে বেশি পাট উৎপাদিত হয় ফরিদপুর জেলায়। জেলার ভাঙ্গা, নগরকান্দা ও সালথা উপজেলায় ব্যাপক পাট চাষ হয়। ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেলসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলেও পাটের আবাদ রয়েছে।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফরিদপুর অঞ্চলের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোঃ রিশাত আব্দুল্লাহ বলেন, “ফরিদপুরে পাটের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এখানেই পাট চাষ ব্যাপকভাবে করলে সুফল পাওয়া যাবে।”
ফরিদপুর ছাড়াও গোপালগঞ্জের সদর, মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী; মানিকগঞ্জের শিবালয়, সিংগাইর ও ঘিওর; পাবনার যমুনার চরাঞ্চল; শরীয়তপুরের বিভিন্ন চরাঞ্চল এবং মুন্সিগঞ্জ সদরসহ চরাঞ্চলে পাট ও পাটবীজ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরসহ পদ্মার চরাঞ্চলে দেশি ও কেনাফজাতীয় পাট এবং পাটবীজ উৎপাদিত হয়। রাজবাড়ীর পাংশা ও বালিয়াকান্দি, মাদারীপুরের কালকিনি, রাজৈর ও সদর, সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা, বিশেষ করে নদী ও চরাঞ্চলেও পাট চাষের সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া যশোরের চৌগাছা, মনিরামপুর, ঝিকরগাছা ও সদর; নওগাঁ সদর ও মান্দা; চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও গোদাগাড়ী; ঠাকুরগাঁও সদর; ঢাকার ধামরাই; বগুড়ার সারিয়াকান্দি; রংপুর ও কুড়িগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা এবং দেশের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী পাট উৎপাদন এলাকায় কৃষকদের মধ্যে পাট চাষের আগ্রহ রয়েছে।
পানির প্রাপ্যতা বড় বিষয়
পাট উৎপাদনের ক্ষেত্রে জমির উপযোগিতার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানির প্রাপ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাট কাটার পর আঁশ ছাড়ানোর জন্য পাটগাছ পচানোর প্রয়োজন হয়। নদী, খাল, বিল, পুকুর কিংবা অন্যান্য জলাশয়ের সুবিধা থাকলে পাট পচানো সহজ হয় এবং উৎপাদিত পাটের মানও ভালো রাখা সম্ভব হয়।
বিএডিসির পাটবীজ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কৃষিবিদ দেবদাস সাহা বলেন, “ঐতিহাসিকভাবে পাট চাষে যেসব জেলার ঐতিহ্য রয়েছে, পাট চাষ নিয়মিত হচ্ছে এবং পাট চাষের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে, পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ রয়েছে, সেখানে আমরা পাট চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এটি আমাদের একটি চ্যালেঞ্জ।”
অনুপযোগী অঞ্চলে পাট চাষ নয়
দেশের কিছু অঞ্চলে পাট চাষের সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত। বিশেষ করে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পাট চাষ খুবই সীমিত কিংবা কার্যত নেই।
স্থানীয় কৃষক, কৃষিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অঞ্চলে পাট চাষে অনাগ্রহের পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক ও পরিবেশগত প্রতিকূলতা। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা, কোথাও জলাবদ্ধতা, পাট পচানোর জন্য পর্যাপ্ত জলাশয়ের অভাব এবং ধানসহ অন্যান্য তুলনামূলক লাভজনক ফসলের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে এসব এলাকার কৃষক পাট চাষে আগ্রহী নন।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) কৃষিবিদ ড. মোঃ ইয়ার উদ্দিন বলেন, অঞ্চলভেদে পাট চাষের বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। যেখানে মাটি, পানি ও পরিবেশ পাট উৎপাদনের অনুকূল নয়, সেখানে শুধু আবাদ বাড়ানোর লক্ষ্যে কৃষকদের পাট চাষে উৎসাহিত করা সমীচীন নয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (পাট উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ) ড. কৃঞ্চা রানী দাস বলেন, “যেসব অঞ্চলে পাট চাষের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানেই পাট চাষ করা যুক্তিসঙ্গত।”
পাঁচ বছরে পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্য
পাট চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি পাটবীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনেও সরকার কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএডিসির চেয়ারম্যান মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন পাটবীজ উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পাট চাষের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তথা পাঁচ বছরে পাটবীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য আমরা কাজ করছি। তবে যেসব অঞ্চলে পাট চাষের প্রতিকূলতা রয়েছে, সেসব অঞ্চলে পাট চাষ করা ঠিক হবে না।”
তার মতে, পাটবীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী ও উপযোগী অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে যাওয়াই বাস্তবসম্মত।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, “দেশে পাটে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে এদেশের পাট চাষের বিশেষজ্ঞ ও কৃষিবিজ্ঞানীরা যেভাবে পরামর্শ দেবেন, সে অনুযায়ী কৃষি মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নেবে।”
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এদেশে কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কাজ করছেন। বিশেষ করে পাট চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, পাটবীজ উৎপাদনে ব্যাপক সফলতা অর্জন আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে আমরা কাজ করছি।”
অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনাই হতে পারে সমাধান
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে পাট চাষ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট—দেশের সব এলাকায় একই কৌশল প্রয়োগ না করে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ফরিদপুরসহ ঐতিহ্যবাহী পাট উৎপাদন অঞ্চল, নদী ও চরাঞ্চল এবং যেসব এলাকায় মাটি, পানি ও পরিবেশ পাট চাষের জন্য উপযোগী, সেখানে উন্নত জাত, মানসম্মত বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজারব্যবস্থার সুযোগ বাড়াতে হবে।
অন্যদিকে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো যেসব অঞ্চলে লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, পানির সংকট কিংবা অন্যান্য ফসলের তুলনামূলক লাভজনকতার কারণে কৃষকের আগ্রহ নেই, সেসব এলাকায় বাস্তবতা বিবেচনা করেই কৃষি পরিকল্পনা নিতে হবে।
কারণ পাটে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের সঠিক পথ হলো—যেখানে পাটের মাটি, পানি, পরিবেশ ও কৃষকের আগ্রহ রয়েছে, সেসব সম্ভাবনাময় অঞ্চলে উৎপাদন বাড়ানো; আর যেখানে এসব অনুকূলতা নেই, সেখানে জোর করে পাট চাষ না করে কৃষকের জন্য উপযোগী ও লাভজনক বিকল্প ফসলকে গুরুত্ব দেওয়া।
এআইএল/সকালবেলা