পৃথিবীর বৃহত্তম ও প্রাচীনতম কবরস্থান ওয়াদি আসসালাম

প্রকাশ: রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ১২:৩৩ অপরাহ্ণ
পৃথিবীর বৃহত্তম ও প্রাচীনতম কবরস্থান ওয়াদি আসসালাম

ইসলামী জীবন ডেস্ক : পৃথিবীর বুকে এমন কিছু স্থান রয়েছে যা কেবল মানুষের জীবনযাত্রার ইতিহাসই বহন করে না, বরং মৃত্যুর পরবর্তী এক শান্তিময় ও গৌরবময় অধ্যায়েরও মহাকাব্যিক সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আধুনিক ইরাকের পবিত্র নাজাফ (Najaf) নগরীতে অবস্থিত ‘ওয়াদি আসসালাম’ (Wadi-us-Salaam) বা ‘ can শান্তির উপত্যকা’ তেমনই এক অলৌকিক ও বিস্ময়কর স্থান। এটি কেবল মৃতদের চিরনিদ্রার এক বৈশ্বিক আবাসস্থলই নয়, বরং মানবসভ্যতার সুদীর্ঘ চৌদ্দশ বছরের ইতিহাস ও ইসলামী স্থাপত্যকলার এক জীবন্ত দলিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লাখো মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠা এই গোরস্থানটি আজও বিশ্বের ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের পরম কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।

আজ রবিবার (৭ জুন) দুপুর ১২টা ১৩ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ধর্ম, দর্শন ও ইসলামী জীবন’ এবং ‘ইসলামী ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও মুসলিম বিশ্ব পর্যবেক্ষণ উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে ওয়াদি আসসালাম কবরস্থানের ইতিহাস, গুরুত্ব ও ভেতরের বিস্ময়কর তথ্যসমূহ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৪৮৫ একর বা ৬ বর্গকিলোমিটারের এক বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত এই কবরস্থানটিকে আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বা বৃহত্তম কবরস্থান হিসেবে অফিসিয়ালি বিবেচনা করা হয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগ অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে আজ ২০blank২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে বিরতিহীনভাবে মুসলিমদের দাফন করা হচ্ছে। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্র থেকে জানা যায়, বর্তমানে এই শান্তির উপত্যকার মাটির নিচে প্রায় ৬০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃতদেহ পরম শান্তিতে সমাহিত রয়েছে। এর অনন্য ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, স্থাপত্যগত এবং ধর্মীয় গুরুত্বের অকাট্য স্বীকৃতি হিসেবে বিগত ২০১১ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো (UNESCO) এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত (World Heritage Site) স্থান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে।

ওয়াদি আসসালাম সমগ্র মুসলিম বিশ্বের, বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও পরম মর্যাদাপূর্ণ একটি পুণ্যভূমি। কারণ, এই বিশাল গোরস্থানের গা ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের চতুর্থ খলিফা, আমীরুল মুমিনীন এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জামাতা ও চাচাতো ভাই আলী (রা.)-এর ঐতিহাসিক ও জাঁকজমকপূর্ণ পবিত্র মাজার শরিফ। এছাড়া ইসলামের ষষ্ঠ ইমাম জাফর সাদিক (রহ.)-এর বহু স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র স্থানও এই এলাকাতেই অবস্থিত। স্থানীয় ইসলামি ঐতিহ্য, দীর্ঘ জনশ্রুতি ও আলেমদের মতে—আল্লাহর দুই মহান নবী হযরত হুদ (আ.) এবং হযরত সালেহ (আ.)-এর পবিত্র রওজা মোবারক বা কবরও এই ওয়াদি আসসালামের পবিত্র সীমানার ভেতরেই সংরক্ষিত রয়েছে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা হয়।

ইসলামী ইতিহাসের প্রাচীন বর্ণনা ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) একবার তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসহাক (আ.)-কে সাথে নিয়ে বর্তমান ইরাকের এই নাজাফ অঞ্চলে তশরিফ এনেছিলেন। সে যুগে এই অঞ্চলটি অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে কুখ্যাত ছিল। কিন্তু নবী ইব্রাহিম (আ.) এই উপত্যকায় পা রাখার সাথে সাথেই অলৌকিকভাবে সেখানকার সব ভূমিকম্প পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে তিনি এক রাতের জন্য পাশের একটি গ্রামে অবস্থান করতে গেলে সেখানে পুনরায় তীব্র ভূকম্পন অনুভূত হয়। এতে এলাকাবাসী আল্লাহর নবীর মোজেজা বুঝতে পেরে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শনপূর্বক তাঁকে স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাসের আকুল অনুরোধ জানায়। নবী ইব্রাহিম (আ.) সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস না করলেও, স্থানীয়দের প্রতি দয়া পরবশ হয়ে নিজের ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে সেখানে একখণ্ড জমি স্থায়ীভাবে ক্রয় করেন। আর আল্লাহর নবীর বরকতময় হাত দিয়ে কেনা সেই পবিত্র জমিই পরবর্তীকালে যুগে যুগে বিস্তৃত হয়ে আজকের এই ‘ওয়াদি আসসালাম’ কবরস্থানে রূপ লাভ করেছে।

ওয়াদি আসসালামের সবচেয়ে তাক লাগিয়ে দেওয়া দিক হলো এর বাহ্যিক অবয়ব। দূর থেকে এটিকে কোনো সাধারণ গোরস্থান বা শ্মশান বলে মনেই হয় না; বরং মনে হয় এটি যেন পাথর ও ইটের তৈরি মৃত মানুষদের এক বিশাল সুপ্রাচীন মেগাসিটি বা শহর। সারি সারি শৈল্পিক কবর, সুউচ্চ সমাধিকক্ষ, কারুকার্যখচিত গম্বুজ এবং বিশেষ সুপ্রাচীন স্থাপত্যশৈলী পুরো এলাকাকে পৃথিবীর বুকে এক স্বতন্ত্র ও অপার্থিব রূপ দিয়েছে। এখানকার অধিকাংশ প্রাচীন কবর ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির লাল ইট দিয়ে নির্মিত এবং সেগুলোর ওপর নিখুঁত প্লাস্টার করে পবিত্র কোরআনের আয়াত, হাদিসের বাণী, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দোয়া ও ধর্মীয় ক্যালিগ্রাফি খোদাই করা হয়েছে। এখানে শুধু সাধারণ একক কবরই নয়, বরং আভিজাত্যপূর্ণ বহু বংশীয় বা পারিবারিক বড় বড় সমাধিকক্ষও দৃশ্যমান।

ভৌগোলিক জায়গার তীব্র সংকট মোকাবিলা করতে ওয়াদি আসসালামে যুগ যুগ ধরে গড়ে তোলা হয়েছে এক অনন্য ভূগর্ভস্থ বহুমুখী সমাধিকক্ষ ও গোপন সুড়ঙ্গপথ। মাটির নিচ দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়া যায় এমন গভীর কক্ষগুলোতে একসঙ্গে ৩০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত মৃতদেহ চমৎকার আইসোলেশনে দাফনের নিখুঁত ব্যবস্থা রয়েছে। এ ধরনের বহুস্তরবিশিষ্ট (Multi-layered) এবং বহুতল সমাধি ব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোনো গোরস্থানে বা সভ্যতায় মেলা ভার। ফলে ওয়াদি আসসালাম শুধু ধর্মীয় ভক্তিই নয়, বরং প্রাচীন স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার (Urban Planning) ক্ষেত্রেও আধুনিক গবেষকদের গবেষণার প্রধান আকর্ষণ।

ইতিহাসের খতিয়ান থেকে দেখা যায়, ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে নির্মিত এখানকার কবরগুলোর অধিকাংশই ছিল প্রায় তিন মিটার উঁচু এবং গোলাকার ও কেল্লা আকৃতির চূড়াবিশিষ্ট, যা মাইলের পর মাইল দূর থেকেও সহজে পথচারীদের চোখে পড়ত। তবে সময়ের বিবর্তনে এবং আধুনিক ২০২৬ সালের ছোঁয়ায় এখনকার নতুন নির্মিত সমাধিগুলোতে আধুনিক সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও মার্জিত স্থাপত্যের ছোঁয়া বেশ স্পষ্ট। আগের প্রাচীন ইট ও প্লাস্টারের পরিবর্তে এখনকার ধনী ও উচ্চবিত্ত পরিবারের কবরগুলোতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মূল্যবান রাজকীয় মার্বেল, গ্রানাইট ও টাইটানিয়ামের মতো দামি পাথর। শুধু তাই নয়, প্রাচীনকালের ছেনি-হাতুড়ির খোদাইয়ের পরিবর্তে এখন অত্যাধুনিক কম্পিউটারাইজড লেজার (Laser Technology) প্রযুক্তির সাহায্যে মৃত ব্যক্তির নাম, তাঁর জীবনবৃত্তান্ত, ছবি এবং পবিত্র কোরআনের ক্যালিগ্রাফি নিখুঁতভাবে পাথরের বুকে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।

ঐতিহাসিকভাবে ইরাকের বিপুলসংখ্যক শিয়া মুসলমানের শেষ ঠিকানার পাশাপাশি অতীতে ভারত, পাকিস্তান, লেবানন, কুয়েত, ইরান এবং সামগ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকেও বিত্তশালী ও ধর্মপ্রাণ মানুষের মৃতদেহ বিশেষ কফিনে করে এনে এখানে দাফন করার এক ব্যাপক আন্তর্জাতিক প্রচলন ছিল। তবে এই কবরস্থানটি কোনো বিশেষ ধনী বা অভিজাত শ্রেণির জন্য এককভাবে সংরক্ষিত নয়; বরং এখানে ধনী-দরিদ্র, আলেম-উলামা, মরমী সুফি, বড় বড় রাজনীতিবিদ কিংবা একদম সাধারণ দিনমজুর—সবাই একই মাটির নিচে কোনো বৈষম্য ছাড়াই সমাহিত হওয়ার সমান ধর্মীয় সুযোগ পান। ওয়াদি আসসালাম কেবল আয়তনে পৃথিবীর বৃহত্তম কবরস্থানই নয়; এটি মূলত মানবসভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাস-ঐতিহ্য, পরকাল ও গভীর মৃত্যুচিন্তার এক অনন্য ও শাশ্বত প্রতীক, যা মানুষকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয় পৃথিবীর ক্ষণস্থায়িত্ব এবং পরম মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী সত্যকে। (তথ্যঋণ : আনাদোলা এজেন্সী, উইকিপিডিয়া)

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন