অসীম দয়ালু আল্লাহ: বান্দার তওবা ও ক্ষমার এক অনন্য দৃষ্টান্ত

প্রকাশ: সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৯ অপরাহ্ণ
অসীম দয়ালু আল্লাহ: বান্দার তওবা ও ক্ষমার এক অনন্য দৃষ্টান্ত

 ইসলাম ডেস্ক: মানুষ অনেক সময় শয়তানের প্ররোচনায় বা নফসের তাড়নায় পাপে লিপ্ত হয়। কিন্তু অপরাধ যত ভয়ংকরই হোক না কেন, আল্লাহর রহমতের দুয়ার বান্দার জন্য কখনোই বন্ধ হয় না। এমনকি এক ব্যক্তি একশটি হত্যাকাণ্ড ঘটানোর মতো জঘন্য অপরাধ করার পরও যখন সত্য অন্তরে ফিরে আসতে চেয়েছিল, মহান আল্লাহ তার জন্য ক্ষমার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন।

হাদিসের আলোকচ্ছটায় সেই ঐতিহাসিক ঘটনা: আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) পূর্ববর্তী যুগের এক ব্যক্তির ঘটনা উল্লেখ করে বলেন— এক লোক নিরানব্বই জন মানুষকে হত্যা করেছিল। এরপর তার মনে তীব্র অনুশোচনা জাগলে সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেমের খোঁজ করে। তাকে একজন উপাসকের (রাহেব) কথা বলা হলে সে সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, "আমি ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছি, আমার কি তওবার কোনো সুযোগ আছে?" সেই উপাসক নেতিবাচক উত্তর দিলে রাগে ও ক্ষোভে সে তাকেও হত্যা করে নিজের সেঞ্চুরি পূর্ণ করে।

পরবর্তীতে সে পুনরায় অনুতপ্ত হয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো জ্ঞানীর সন্ধান চায়। এবার একজন প্রকৃত আলেমের কাছে গিয়ে সে নিজের একশটি খুনের কথা স্বীকার করে তওবার পথ জানতে চায়। সেই প্রাজ্ঞ আলেম বললেন, "অবশ্যই তওবার সুযোগ আছে। তোমার আর তওবার মাঝে বাধা হওয়ার সাধ্য কার? তবে তুমি এই পাপাচারী জনপদ ছেড়ে অমুক দেশে চলে যাও, যেখানে একদল মানুষ আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন। তুমিও তাদের সঙ্গে শামিল হও এবং নিজের পুরনো ঠিকানায় আর কখনো ফিরো না; কারণ ওই পরিবেশ তোমার জন্য অনিষ্টকর।"

লোকটি সেই পুণ্যভূমির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল। কিন্তু বিধিবাম! অর্ধেক পথ অতিক্রম করতেই তার মৃত্যু ঘনিয়ে এল। এবার রহমত ও আজাবের ফেরেশতাদের মধ্যে তাকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হলো। রহমতের ফেরেশতারা বললেন, "সে একনিষ্ঠভাবে তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসছিল।" আর আজাবের ফেরেশতারা বললেন, "সে জীবনে কখনো কোনো নেক কাজ করেনি।"

এমন সময় মানুষের বেশে এক ফেরেশতা বিচারক হিসেবে আসলেন। তিনি ফয়সালা দিলেন, "তোমরা দুই দিকের দূরত্ব মেপে দেখো। যেদিকের দূরত্ব কম হবে, তাকে সেই দেশের লোক বলেই গণ্য করা হবে।" পরিমাপ করে দেখা গেল, সে তার গন্তব্যের (পুণ্যভূমির) দিকে সামান্য বেশি এগিয়ে ছিল। ফলশ্রুতিতে রহমতের ফেরেশতারা তার রুহ কবজ করলেন এবং আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৬৯০১)

  • নিরাশ হওয়া বারণ: পাপের পাহাড় যত বিশালই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও অসীম। আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করতে পারেন।

  • তওবার দুয়ার উন্মুক্ত: মৃত্যু আসার আগ পর্যন্ত তওবার দরজা খোলা থাকে। জীবনের যেকোনো পর্যায়ে মানুষ সঠিক পথে ফিরে আসতে পারে।

  • সঠিক আলেমের গুরুত্ব: দ্বীনি বিষয়ে সঠিক সমাধানের জন্য আবেগী নয়, বরং প্রাজ্ঞ ও প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন আলেমের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য।

  • পরিবেশের প্রভাব: গুনাহ থেকে বাঁচতে হলে অসৎ সঙ্গ এবং পাপের পরিবেশ ত্যাগ করে নেককারদের সান্নিধ্যে যাওয়া জরুরি।

  • নিয়ত ও সংকল্প: লোকটি গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারলেও কেবল তার আন্তরিক ইচ্ছা ও প্রচেষ্টার কারণেই আল্লাহ তাকে জান্নাতি ঘোষণা করেছেন।

উপসংহার: তওবা মানে কেবল মুখে ক্ষমা চাওয়া নয়, বরং পাপের অন্ধকার ছেড়ে রহমতের আলোর দিকে পথ চলা। এই হাদিস আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, মানুষের অতীত নয়—বরং তার শেষ পরিণতির আন্তরিকতাই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। আল্লাহ চান তাঁর প্রতিটি বান্দা যেন অভিমান ছেড়ে সত্যের পথে ফিরে আসে।

মন্তব্য করুন