সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া সংবাদ বা গুজব শেয়ার করা কি গুনাহ

প্রকাশ: সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ০৫:২৫ অপরাহ্ণ
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া সংবাদ বা গুজব শেয়ার করা কি গুনাহ
নিজস্ব প্রতিবেদক : আধুনিক ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে একটি সংবাদ, ছবি কিংবা ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগকে সহজ করলেও এর অপব্যবহারের ফলে মিথ্যা সংবাদ, ব্যক্তিগত কুৎসা, গুজব ও অপপ্রচারের হারও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আজ একটি ভুল ফেসবুক পোস্ট বা শেয়ার মানুষের সামাজিক সম্মান ধূলিসাৎ করতে পারে, সমাজে চরম অস্থিরতা বা দাঙ্গা সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি মানুষের জীবনও বিপন্ন করে তুলতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে তথ্য প্রচার কোনো সাধারণ বিষয় নয়; এটি একটি পবিত্র আমানত এবং সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

আজ সোমবার (৮ জুন) বিকেল ৫টা ৯ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ইসলামী আইন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারা’ এবং ‘পবিত্র কুরআন-হাদিস গবেষণা, ফিকহ চর্চা ও ফতোয়া উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া সংবাদ ও গুজব ছড়ানোর ভয়াবহতা এবং এর ইসলামিক বিধান বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ইসলামী শরিয়তের আলোকে জেনে-শুনে যেকোনো ভুয়া সংবাদ বা মিথ্যা তথ্য শেয়ার করা সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এমনকি কোনো সংবাদ সত্য নাকি মিথ্যা—তা নিশ্চিত না হয়ে কেবল ‘শোনা কথা’ হিসেবে শেয়ার করাও গুনাহের কারণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে মুমিনদের সতর্ক করে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, “হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও, অন্যথায় অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে ফেলবে এবং পরে নিজেদের কাজের জন্য অনুতপ্ত হবে।” (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৬)। এই আয়াতটিকে ইসলামের তথ্য-যাচাই নীতির মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। মুফাসসিরদের মতে, সমাজে কোনো তথ্য ছড়ানোর আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করা ‘ফরজে কিফায়া’ বা সামাজিক দায়িত্ব।

একইভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুখরোচক বা শোনা কথা প্রচারের ব্যাপারে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই ছাড়া) তাই বলে বেড়ায়।” (সহিহ মুসলিম)। বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম নববী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, যে ব্যক্তি সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে শোনা কথা প্রচার বা ফরোয়ার্ড করে, সে অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও সরাসরি মিথ্যার অংশীদার হয়ে যায়।

ভুয়া সংবাদ কেবল মিথ্যাই নয়, অনেক সময় এটি গীবত, অপবাদ, মানহানি ও সমাজে মারাত্মক ফিতনা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে মানুষের চরিত্রহননমূলক অপবাদ ছড়ানোকে ইসলামে জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে মদিনার মুনাফিকরা যে মিথ্যা অপবাদ রটিয়েছিল, তা ‘হাদিসে ইফক’ নামে পরিচিত। তখন অনেক সাধারণ মুসলমানও যাচাই না করে সেই গুজবে কান দিয়েছিলেন এবং তা ছড়াতে সাহায্য করেছিলেন। পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এর তীব্র নিন্দা করে অবতীর্ণ করেন, “ তোমরা যখন তা শুনেছিলে, তখন কেন বলোনি—এ বিষয়ে কথা বলা আমাদের জন্য শোভন নয়, এটি তো মহা অপবাদ!” (সূরা আন-নূর, আয়াত: ১৬)।

ইসলামের চার মাযহাবের প্রধান ইমাম—ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.), ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং মানুষের হক বা সম্মান নষ্ট করে এমন মিথ্যা প্রচার করা সম্পূর্ণরূপে হারাম।

তবে ফিকহ শাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কেউ যদি নিজের যথাসাধ্য চেষ্টা ও বিশ্বস্ত সূত্রের ওপর ভিত্তি করে কোনো সংবাদকে সত্য মনে করে শেয়ার করেন এবং পরবর্তীতে সেটি ভুল বা মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে তিনি ইচ্ছাকৃত অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন না। কিন্তু যিনি অলসতা বা অবহেলাবশত, সাময়িক উত্তেজনা থেকে কিংবা সস্তা লাইক-শেয়ারের জনপ্রিয়তার লোভে ‘আগে শেয়ার করি, পরে দেখা যাবে’ মানসিকতা নিয়ে গুজব ছড়াবেন, তিনি অবশ্যই আল্লাহর দরবারে গুনাহগার হিসেবে সাব্যস্ত হবেন।

ইসলামী ফিকহের একটি প্রসিদ্ধ নীতি হলো, ‘যে ব্যক্তি কোনো গুনাহের কাজে সহযোগিতা করে, সে সেই গুনাহে অংশীদার হয়।’ যার মূল ভিত্তি সূরা আল-মায়েদার ২ নম্বর আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে, “তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।” সুতরাং, ডিজিটাল যুগে একটি সাধারণ ক্লিকের মাধ্যমে যেমন বিপুল সওয়াব অর্জন সম্ভব, তেমনি একটি অসতর্ক শেয়ারের মাধ্যমে মৃত্যুর পরও জারি থাকবে এমন ভয়াবহ গুনাহের বোঝাও কাঁধে চেপে বসতে পারে। তাই প্রতিটি শেয়ার বা মন্তব্যের ক্ষেত্রে একজন মুমিনকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও জবাবদিহিতার মানসিকতা বজায় রাখতে হবে।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন