রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোরবানি কেমন ছিল

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ০২:৪৫ অপরাহ্ণ
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোরবানি কেমন ছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক: কোরবানি কেবল একটি পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মহান আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, পরম ত্যাগ, গভীর আনুগত্য ও তাকওয়ার এক অনন্য প্রতীক। ইসলামের এই অন্যতম প্রধান ইবাদতকে মুসলিম উম্মাহর মাঝে সর্বোচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি নিজে যেমন নিজ হাতে কোরবানি সম্পাদন করেছেন, তেমনি উম্মতকেও এর প্রকৃত শিক্ষা দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ প্রদর্শন করেছেন।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পরই মূলত কোরবানির বিধান অবতীর্ণ হয়। তবে কোরবানি মানব ইতিহাসের কোনো নতুন প্রথা নয়; মানবজাতির আদি পিতা আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই এর ধারাবাহিকতা চলে আসছে। পবিত্র কুরআনে আদম (আ.)-এর দুই পুত্র কাবিল ও হাবিলের কোরবানির ঘটনা এর বড় প্রমাণ। আর বর্তমান মুসলিম সমাজ যে কোরবানি আদায় করে, তা মূলত মিল্লাতে ইব্রাহিমের একনিষ্ঠ অনুসরণ। তাঁরই মহান স্মৃতি ও আত্মত্যাগকে ধারণ করার জন্য উম্মতের ওপর কোরবানি ওয়াজিব করা হয়েছে।

হাদিস ও সুন্নাহর আলোকে মহানবী (সা.)-এর কোরবানির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

সাহাবায়ে কেরাম একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কোরবানি প্রথাটা কী?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘এটি তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত।’ সাহাবারা পুনরায় জানতে চান, ‘এতে আমাদের কী লাভ বা সওয়াব রয়েছে?’ আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি বা সওয়াব পাওয়া যাবে।’ এমনকি দুম্বা, ভেড়া বা উটের পশমের ক্ষেত্রেও সমান সওয়াব মিলবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন (ইবনে মাজাহ)।

হাদিস বিশারদেরা একটি গণমাধ্যমকে জানান, মদিনার ১০ বছরের জীবনে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিবছরই কোরবানি আদায় করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, রাসুল (সা.) মদিনায় থাকাকালীন কোনো বছরই কোরবানি বাদ দেননি (তিরমিজি)।

মহানবী (সা.) সাধারণত ঈদগাহেই কোরবানির পশু জবেহ বা নহর করতেন। তিনি উট, গরু এবং ভেড়া সবই কোরবানি করতেন এবং অধিকাংশ সময় তা নিজ হাতে সম্পন্ন করতেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, নবী করিম (সা.) সাধারণত প্রতিবছর দুটি ভেড়া কোরবানি দিতেনযার একটি নিজের ও পরিবারের জন্য এবং অন্যটি তাঁর উম্মতের পক্ষ থেকে (সহিহ বুখারি)।

কোরবানির জন্য সুস্থ, সবল ও সুন্দর পশু নির্বাচন করা সুন্নাত। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোরবানি করার ইচ্ছা করতেন, তখন চিত্রবিচিত্র (খাসি রঙ বা ডোরাকাটা), শিংবিশিষ্ট এবং বেশ মোটাতাজা দুটি খাসি-ভেড়া পছন্দ করতেন। এর একটি জবেহ করতেন আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেওয়া উম্মতদের জন্য এবং অন্যটি নিজের ও পরিবারের জন্য (ইবনে মাজাহ)।

হাদিসে এসেছে, বিদায় হজের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কোরবানি করেছিলেন (সহিহ বুখারি)। এছাড়া সেই ঐতিহাসিক হজে তিনি ‘দমে শোকর’ হিসেবে মোট ১০০টি উট কোরবানি করেন, যার মধ্যে ৬৩টি উট তিনি নিজে জবেহ করেন এবং বাকিগুলো জবেহ করার দায়িত্ব দেন হযরত আলী (রা.)-কে। উটের কোরবানিতে তিনি হযরত আলী (রা.)-কে শরিক করেছিলেন।

ইসলামী আইনবিদ ও গবেষকেরা গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, মহানবী (সা.) কোরবানির গোশত নিজে খেতেন, পরিবারকে খাওয়াতেন এবং আত্মীয় ও মিসকিনদের মাঝে সদকা করতেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) কোরবানির গোশত তিন ভাগ করতেন—এক-তৃতীয়াংশ নিজের পরিবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ প্রতিবেশীদের জন্য এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ অভাবী মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। ফিকহবিদদের মতে, গোশত এভাবে তিন ভাগ করা মুস্তাহাব, তবে পরিবারের সদস্য বেশি হলে নিজেরা বেশি রাখলেও কোনো গুনাহ নেই।

শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী উট, গরু, মহিষ, দুম্বা, ভেড়া ও ছাগল দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ। তবে এগুলোর নির্দিষ্ট বয়স পূর্ণ হতে হবে। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার বয়স কমপক্ষে এক বছর; গরু ও মহিষের বয়স দুই বছর এবং উটের বয়স কমপক্ষে পাঁচ বছর পূর্ণ হতে হবে।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, মহানবী (সা.)-এর কোরবানি মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনুপম আদর্শ। কোরবানির মূল উদ্দেশ্য কেবল রক্ত প্রবাহিত করা বা গোশত খাওয়া নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্তরের তাকওয়া ও আত্মত্যাগ জাগ্রত করাই এর মূল লক্ষ্য।

জান্নাত সকালাবেলা

মন্তব্য করুন