তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে গরমকে গালি দেওয়ার ধর্মীয় পরিণতি

প্রকাশ: সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ০১:৩১ অপরাহ্ণ
তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে গরমকে গালি দেওয়ার ধর্মীয় পরিণতি
নিজস্ব প্রতিবেদক : গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহে দেশজুড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড রোদের তাপে মাঠে-ময়দানে খেটে-খাওয়া দিনমজুর, রিকশাচালক ও সাধারণ শ্রমিকদের দৈনন্দিন কাজকর্ম করা চরম কষ্টসাধ্য ও বড় রকমের ধকলের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অসহ্য গরমে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক সাধারণ মানুষই মনের অজান্তে কিংবা ক্ষোভের বশে গরম, রোদ বা আবহাওয়াকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন কটূক্তি ও গালিগালাজ করে থাকেন। তবে পবিত্র ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী, কোনো মুমিন ব্যক্তি কখনোই এমন আচরণ করতে পারেন না। ইসলামে মানুষ তো দূরের কথা, অবস্তুগত কোনো সৃষ্টি বা প্রকৃতির কোনো উপাদানকে গালি দেওয়া বা অভিশাপ দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম (Forbidden) ও বড় ধরণের গুনাহের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

আজ সোমবার (৮ জুন) দুপুর ১২টা ০৬ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ইসলাম ও সমকালীন সমাজ, জবান হেফাজত ও নৈতিকতা রক্ষা’ এবং ‘আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন ফতোয়া ডেস্ক, হাদিস রিসার্চ ও সামাজিক ব্যাধি সচেতনতা উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে গরমকে গালি দেওয়ার ধর্মীয় ভয়াবহতা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, যেকোনো পরিস্থিতিতে গালিগালাজ করা বা অভিশাপ দেওয়া সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এটি কোনো মুমিনের স্বভাব হতে পারে না, বরং এটি মুনাফিকদের অন্যতম লক্ষণ। মানুষ ছাড়াও পশু-পাখি, রোগবালাই, সময় কিংবা বাতাসকে গালি দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, বাতাস মূলত আল্লাহরই একটি বিশেষ হুকুম বা নির্দেশ। তা কখনো মানুষের জন্য রহমত বা আশীর্বাদ নিয়ে আসে, আবার কখনো পাপের কারণে আজাব বা শাস্তি নিয়ে আসে। সুতরাং তোমরা যখন তীব্র বাতাস বা ঝড় দেখবে, তখন তাকে গালি দেবে না। বরং আল্লাহর কাছে এর ভেতরের কল্যাণ কামনা করবে এবং এর অকল্যাণ থেকে মহান আল্লাহর আশ্রয় চাইবে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৯৭)।

ইসলামি গবেষকদের মতে, গরম হলো একটি তাপীয় অনুভূতি, যার সুনির্দিষ্ট কোনো শারীরিক অবয়ব বা শরীর নেই। এটি কেবল অনুভব করা যায়, কিন্তু স্পর্শ করা যায় না। ফলে গরম কোনো গালির যোগ্য বস্তু নয় এবং এই গালি গরমের গায়ে স্পর্শও করে না। যেহেতু গালিটি অপাত্রে বা একটি অবস্তুগত বিষয়ের ওপর দেওয়া হয়, তাই আধ্যাত্মিক নিয়ম অনুযায়ী তা সরাসরি গালিদাতার নিজের ওপরই ফিরে আসে।

এই বিষয়ে সুনানে আবু দাউদের অন্য একটি বিখ্যাত হাদিসে (হাদিস নম্বর: ৪৯০৫) রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, “যখন কোনো ব্যক্তি কাউকে বা কোনো কিছুকে অভিশাপ দেয়, তখন সেই অভিশাপটি আকাশের দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু আকাশের দরজাগুলো তার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর তা পুনরায় দুনিয়াতে ফিরে আসার জন্য রওনা হয়, কিন্তু দুনিয়াতে আসার পথও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সে ডানে-বামে যাওয়ার চেষ্টা করে কোনো পথ না পেয়ে অবশেষে যাকে অভিশাপ করা হয়েছে, তার কাছে ফিরে যায়। সে যদি ওই অভিশাপের যোগ্য হয় তবে তার ওপর পড়ে, অন্যথায় তা সরাসরি অভিশাপকারীর ওপরই পতিত হয়।”

দেশের প্রখ্যাত ইসলামি ব্যক্তিত্ব এবং আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউবে (YouTube) এই সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তীব্র ক্ষোভ ও সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের সমাজের অনেকেরই একটি অত্যন্ত বাজে বা বদঅভ্যাস আছে যে, দেশে একটু বেশি গরম পড়লেই তারা গরমের চৌদ্দগোষ্ঠী তুলে গালিগালাজ শুরু করে দেয়। আবহাওয়ার ওপর এভাবে ক্ষোভ ঝাড়া ও গালিগালাজ করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ। কারণ এই গালি তো গরমের গায়ে লাগে না। ফলে অপাত্রে করা এই গালি বা অভিশাপের সম্পূর্ণ দায় ও পাপ ওই ব্যক্তির নিজের আমলনামায় এসে পড়ে।”

পবিত্র কুরআনের সুরা আহজাবের ৫৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘যারা বিনা অপরাধে ইমানদার পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ এবং স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে।’ তাই যেকোনো তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা তীব্র গরমে অতিষ্ঠ না হয়ে মুমিন বান্দার উচিত বেশি বেশি ইস্তিগফার করা, আল্লাহর কাছে প্রশান্তি কামনা করা এবং নিজের জবানকে সব ধরণের পাপ থেকে মুক্ত রাখা।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন