বদলি হজ করার সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি
ধর্ম ডেস্ক : ইসলামের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত হলো পবিত্র হজ। কোনো মুসলিমের ওপর হজ ফরজ হওয়ার পর প্রয়োজনীয় আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি সেই ব্যক্তি হজ আদায়ে অবহেলা বা বিলম্ব করেন এবং পরবর্তীতে আকস্মিক অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে তাঁর জন্য শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী ‘বদলি হজ’ করানোর বিধান রয়েছে। বিশেষ করে বার্ধক্যজনিত কারণে পুরোপুরি শারীরিকভাবে অক্ষম, দীর্ঘমেয়াদী বা নিরাময় অযোগ্য জটিল অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা কোনো মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তাঁর পরিবার বা প্রতিনিধি এই বিশেষ হজ পালন করতে পারেন।
পবিত্র ইসলাম ধর্মে বদলি হজের পূর্ণ অনুমোদন ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘মানুষের মধ্যে যারা সেখানে (বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর) যাওয়ার সামর্থ্য রাখে, তাদের ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করা আবশ্যক।’ তবে কোনো ব্যক্তি যদি হজের আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও চিরতরে বা স্থায়ীভাবে শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, তবে তাঁর ফরজ হজ আদায়ের উদ্দেশ্যে অন্য কোনো যোগ্য প্রতিনিধি নিয়োগের অনুমতি ও স্পষ্ট বিধান দিয়েছেন যুগের শ্রেষ্ঠ ওলামায়ে কেরামগণ।
ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, যিনি ইতিমধ্যে নিজের জীবনের ফরজ হজ অত্যন্ত সফলভাবে ও সঠিকভাবে আদায় করেছেন, এমন কোনো অভিজ্ঞ ও দ্বীনদার ব্যক্তিকে বদলি হজের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো সবচেয়ে উত্তম ও নিরাপদ। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি এখনো নিজের জীবনের ফরজ হজ নিজে আদায় করেননি, তাঁকে অন্য কারও বদলি হজের উদ্দেশ্যে মক্কায় পাঠানো ‘মাকরুহে তানজিহি’ অর্থাৎ অত্যন্ত অনুত্তম কাজ। তবে শরিয়তের মাসআলা অনুযায়ী, নিজের হজ না করা কোনো ব্যক্তি যদি অন্য কারও পক্ষ থেকে বদলি হজে যান, তবে সেই ব্যক্তির বদলি হজ আদায় বা সম্পন্ন হয়ে যাবে। তবুও অত্যন্ত সতর্কতার খাতিরে এমন মানুষকে বদলি হজে পাঠানো উচিত, যিনি অন্তত একবার আল্লাহর ঘর জিয়ারত তথা নিজের হজ সম্পন্ন করেছেন।
বদলি হজের মূল পদ্ধতি ও আনুষ্ঠানিকতা একদম সাধারণ বা স্বাভাবিক হজের মতোই। যে সুনির্দিষ্ট নিয়মে ও পদ্ধতিতে একজন সাধারণ হাজি নিজের ফরজ হজ আদায় করে থাকেন, ঠিক সেই একই নিয়ম ও রিকোয়ারমেন্ট মেনে বদলি হজও আদায় করতে হয়। এখানে মূল ও একমাত্র পার্থক্য হলো ইহরাম বাঁধার সময়কার নিয়ত। বদলি হজকারী ব্যক্তি যখন মিকাত বা নির্দিষ্ট স্থান থেকে ইহরাম সম্পন্ন করবেন, তখন মনে মনে এবং মুখে যার পক্ষ থেকে হজ করা হচ্ছে—তার নাম উল্লেখ করে হজ করার দৃঢ় নিয়ত বা সংকল্প করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে কেবল মনে মনে নিয়ত করার চেয়ে মুখে উচ্চারণ বা মৌখিকভাবে নিয়ত করাকে ওলামায়ে কেরাম উত্তম বলেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ইহরাম বাঁধার সময় বদলি হজকারীকে এভাবে বলতে হবে যে, ‘আমি আমার ফুফু (নাম) বা অমুকের পক্ষ থেকে পবিত্র হজের ইহরাম করছি।’ কেউ যদি তামাত্তু হজ (একই সফরে প্রথমে ওমরাহ ও পরে হজ) করার ইচ্ছা পোষণ করেন, তবে সফরের শুরুতে ওমরাহর ইহরাম ও নিয়ত করার সময়ও একইভাবে মূল ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে নিয়ত করতে হবে।
যিনি অন্যের টাকা বা খরচে বদলি হজ করতে যাচ্ছেন, তাঁর জন্য অত্যন্ত জরুরি ও অবশ্য পালনীয় বিষয় হলো—পুরো সফরে যাতায়াত, আবাসন, কোরবানি এবং পানাহারের খরচ যেন অত্যন্ত ইনসাফ, সততা ও পরিমিতিবোধের সাথে করা হয়। কারণ, হজে প্রেরণকারী ব্যক্তি বা তাঁর পরিবার বদলি হজকারীর কাছে যে টাকা হস্তান্তর করেছেন, তা মূলত আল্লাহর ঘরের সফরের জন্য একটি পবিত্র ‘আমানত’। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ও হিসেবি হয়ে আল্লাহর ভয় অন্তরে রেখে তা খরচ করা উচিত। সফরে কোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয়, বিলাসিতা বা অপচয়মূলক খরচ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
হজ ও ওমরার সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা এবং সফর শেষে যদি প্রেরিত মূল টাকার কোনো অংশ উদ্বৃত্ত বা বাকি থাকে, তবে সেই বেঁচে যাওয়া টাকা মূল মালিক বা তাঁর ওয়ারিশদের কাছে সততার সাথে ফিরিয়ে দেওয়া ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত জরুরি। অবশ্য, হজে প্রেরণকারী ব্যক্তি যদি খুশি হয়ে বা সন্তুষ্ট চিত্তে বদলি হজকারীকে সেই উদ্বৃত্ত বা বেঁচে যাওয়া টাকা হাদিয়া কিংবা উপহার হিসেবে দিয়ে দেন, তাহলে বদলি হজকারী ব্যক্তি তা নিজের কাছে রেখে দিতে পারবেন এবং তা ভোগ করতে পারবেন।
জান্নাত সকালাবেলা
|