খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে স্মার্ট কৃষি: স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তিতে ব্রির নতুন দিগন্ত

প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৩ অপরাহ্ণ
খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে স্মার্ট কৃষি: স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তিতে ব্রির নতুন দিগন্ত
ব্রির স্থানভিত্তিক গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে ধান চাষের দৃশ্য

ড. মো. আনোয়ার হোসেন  : বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় কৃষি কেবল একটি উৎপাদন খাত নয়; এটি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গ্রামীণ জীবনের মূল ভিত্তি। স্বাধীনতার পর থেকে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশের অর্জিত সাফল্য বিশ্বের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ী উন্নয়নগাথা। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভূগর্ভস্থ পানির অপচয়, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, আবাদযোগ্য জমির ক্রমহ্রাস, কৃষিশ্রমিকের সংকট এবং অনিয়মিত আবহাওয়া আমাদের খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ধান উৎপাদনে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে ব্রি বাস্তবায়ন করছে স্থানভিত্তিক গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন।

বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও এর ভৌগোলিক ও কৃষি-পরিবেশগত বৈচিত্র্য অনন্য। দেশের ৩০টি কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল (Agro-Ecological Zone) মাটি, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও পানির প্রাপ্যতার দিক থেকে একে অপরের থেকে আলাদা। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা ও জোয়ার-ভাটা, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা, হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টি এবং উত্তরাঞ্চলে তীব্র শীত—সব মিলিয়ে প্রতিটি অঞ্চলের কৃষি-চ্যালেঞ্জ ভিন্ন। ফলে একক কোনো ধানের জাত বা প্রযুক্তি সারা দেশে সমান ফলন দিতে পারে না। বিশ্বজুড়ে কৃষি গবেষণায় এখন ‘Genotype × Environment Interaction (G×E)’-কে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, যা স্পষ্ট করে যে নির্দিষ্ট জিনের সফলতা স্থানীয় পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। তাই ব্রির বর্তমান গবেষণা-দর্শন অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট—“সঠিক অঞ্চলের জন্য সঠিক ধানের জাত, সঠিক প্রযুক্তি এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা।”

বর্তমানে ব্রি উদ্ভাবিত উফশী জাতসমূহ দেশের প্রায় ৭৭ শতাংশ জমিতে চাষ হয় এবং জাতীয় চাল উৎপাদনের প্রায় ৮৫ শতাংশে অবদান রাখছে। তবে আমাদের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০৩০ সালে চালের চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে ৪ কোটি ৬৯ লাখ টনে, ২০৪১ সালে ৫ কোটি ৪১ লাখ টনে এবং ২০৫০ সালে তা ৬ কোটি ৯ লাখ টনে পৌঁছাবে। সংকুচিত হতে থাকা জমি থেকে এই বর্ধিত চাহিদা মেটাতে স্থানভিত্তিক ও টেকসই উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

এই প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখেই আমরা ‘নতুন ৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণাগার উন্নয়ন (LSTD)’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। এটি কেবল কাঠামোগত সম্প্রসারণ নয়; বরং কেন্দ্রীয় গবেষণা কার্যক্রমকে আঞ্চলিক বাস্তবতা ও কৃষকের সরাসরি সমস্যা সমাধানের উপযোগী করে তোলার একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলায় ইতোমধ্যে আমরা বেশ কিছু যুগান্তকারী জাত উদ্ভাবন করেছি। হাওরাঞ্চলের আকস্মিক বন্যা এড়াতে ব্রি ধান-১১৮, উপকূলের লবণাক্ততা-সহনশীল ব্রি ধান-১১৭, উচ্চফলনশীল ও ঢলে পড়া-প্রতিরোধী ব্রি ধান-১১৬ এবং প্রতিকূল পরিবেশের উপযোগী ব্রি হাইব্রিড ধান-১০ চাষাবাদে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। পাশাপাশি, পাহাড়ি অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় পরিবেশের উপযোগী উচ্চফলনশীল কালো বিন্নি, লেট বোরো ধান, সুগন্ধি প্রিমিয়াম কোয়ালিটির জাত এবং পানি-সাশ্রয়ী ধানের উদ্ভাবনী গবেষণা চলমান রয়েছে।

জাতের পাশাপাশি স্থানভিত্তিক প্রযুক্তির সমন্বয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মানসম্পন্ন জাত থাকলেও যদি চারা রোপণ, সার ও পানি ব্যবস্থাপনা কিংবা ফসল কাটার প্রযুক্তিতে ঘাটতি থাকে, তবে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া সম্ভব নয়। এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় আমরা মাঠপর্যায়ে সাশ্রয়ী ও আধুনিক যন্ত্র উদ্ভাবন করছি। শীতপ্রধান অঞ্চলের জন্য ‘সিড জার্মিনেশন অ্যাক্সিলারেশন’, হাওরের কর্দমাক্ত জমির জন্য ‘বোট-টাইপ হাইড্রো টিলার’, দ্রুত ধান মাড়াই ও ব্যাগিংয়ের জন্য ‘ওপেন ড্রাম থ্রেসার’, আইওটি-ভিত্তিক ‘ম্যাট-টাইপ সিডলিং রেইজিং সিস্টেম’, সৌরশক্তিচালিত সেচব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় AWD এবং যান্ত্রিক উপায়ে বাড়ি বাড়ি ধান সিদ্ধের জন্য ‘ভ্রাম্যমাণ ধান সিদ্ধকরণ যন্ত্র’ উদ্ভাবন করা হয়েছে।

গবেষণাগার ও কৃষকের মাঝের ব্যবধান দূর করতে আমাদের একটি অগ্রাধিকারমূলক কৌশল হলো ‘প্রযুক্তি গ্রাম’। প্রথাগত গবেষণায় উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে বিলম্ব হতো। কিন্তু প্রযুক্তি গ্রামে গবেষক, কৃষি সম্প্রসারণকর্মী এবং কৃষক সরাসরি একসঙ্গে কাজ করছেন। এখানে কৃষকেরা নিজ চোখে আধুনিক জাত ও যন্ত্রের ব্যবহার দেখে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ফলে প্রযুক্তি গ্রহণের হার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এটি উদ্ভাবিত প্রযুক্তি যাচাই এবং নতুন গবেষণার ফিডব্যাক পাওয়ার একটি অংশগ্রহণমূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।

কৃষিকে আধুনিক ও স্মার্ট করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। ‘বাংলার ধান ইনফো’ ও ‘স্মার্ট রাইস প্রোফাইল’-এর মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আঞ্চলিক আবহাওয়া ও মাটির উপযোগী পরামর্শ সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি উদ্ভাবন কেবল স্বল্পমেয়াদি কোনো সফলতা নয়; এটি আমাদের জাতীয় কৌশলগত বিনিয়োগ। এলএসটিডি প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন আঞ্চলিক কার্যালয়, আধুনিক গবেষণাগার, স্যাটেলাইট স্টেশন ও প্রযুক্তি গ্রামের যে টেকসই অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, তা বৈশ্বিক ‘Precision Agriculture’ ও ‘Climate-Smart Agriculture’-এর সঙ্গে বাংলাদেশকে তাল মিলিয়ে চলতে সহায়তা করছে।

আগামীর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি খাত এবং সর্বোপরি আমাদের কৃষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। ব্রির এই স্থানভিত্তিক জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন কার্যক্রম বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনকে কেবল আত্মনির্ভরশীল রাখবে না, বরং জলবায়ু-সহনশীল স্মার্ট কৃষিতে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে একটি অনন্য মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

প্রকল্প পরিচালক
‘নতুন ৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণাগার উন্নয়ন (এলএসটিডি) প্রকল্প’
ব্রি, গাজীপুর

মন্তব্য করুন