তাওহিদ হৃদয়ের পুরস্কারের লাল গাড়ি ও ক্যানসার আক্রান্ত মায়ের গল্প
ক্রীড়া প্রতিবেদক:বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘বীরপুরুষ’ কবিতার সেই অমর পঙ্ক্তি—“মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে, মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে... তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে... আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে...” — লাইনগুলো যেন কাল্পনিক কোনো কাব্য নয়, বরং বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের তারকা ব্যাটার তাওহিদ হৃদয়ের বাস্তব জীবনের এক জীবন্ত চিত্রনাট্য। মাঠের ২২ গজে বোলারদের ওপর চড়াও হওয়া এই বিধ্বংসী ব্যাটারের ভেতরের নরম ও মাতৃভক্ত কন্ডিশনটি গতকাল রাতে উন্মোচিত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দেশের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজে অসাধারণ পারফরম্যান্সের সুবাদে সিরিজের সেরা ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল ক্রিকেটার’ হিসেবে একটি চেরি ব্র্যান্ডের লাল টকটকে রাজকীয় গাড়ি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। আর সেই গাড়িটি নিজের ক্যানসার আক্রান্ত মমতাময়ী মায়ের চরণে উৎসর্গ করে হৃদয় যে বার্তা দিয়েছেন, তা কোটি ভক্তের চোখ ভিজিয়ে দিয়েছে।
আজ সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ক্রীড়া খতিয়ান’ এবং ‘প্লেয়ার প্রোফাইল, হিউম্যান ইন্টারেস্ট স্টোরিজ ও সোশ্যাল মিডিয়া ট্র্যাকিং উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে তাওহিদ হৃদয়ের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পেছনের মায়ের ত্যাগ ও আবেগঘন খোলা চিঠির খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
অফিশিয়াল ম্যাচ পরবর্তী পুরস্কার বিতরণী খতিয়ান অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচ শেষে তাওহিদ হৃদয়ের হাতে চেরি ব্র্যান্ডের এই লাল গাড়ির চাবি তুলে দেওয়া হয়। গাড়িটি পাওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে গাড়ির সাথে নিজের একটি ছবি পোস্ট করেন হৃদয়।
সেই ভাইরাল হওয়া ফেসবুক পোস্টে হৃদয় অত্যন্ত আবেগঘন মেথডে লেখেন, “মা, তোমার জন্য একটা গাড়ি কেনার নিয়ত করেছিলাম, তার কয়েক দিনের মধ্যেই পেয়ে গেলাম! অদ্ভুত না?” সুসন্তান হিসেবে বাবা-মায়ের প্রতি সব সন্তানেরই দায়িত্ব থাকে, তবে তাওহিদ হৃদয় ও তার মায়ের এই পুনর্জন্মের গল্পটা একটু আলাদা ও কষ্টের কন্ডিশন দিয়ে ঘেরা।
আজ ‘বাংলাদেশের তাওহিদ হৃদয়’ হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় মেথডলজি ও অবদান ছিল তাঁর মায়ের। শৈশবে যখন হৃদয়ের মনে এক বিশ্বমানের ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন dāna বাঁধছিল, তখন ঢাকার ভালো একাডেমিতে ভর্তি করার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না তাঁর মধ্যবিত্ত পরিবারের। সংসারে চলছিল তীব্র টানাটানি। কিন্তু ছেলের চোখের ভেতরের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ঠিকই পড়তে পেরেছিলেন তাঁর মমতাময়ী মা।
কাউকে কিছু না জানিয়ে, এমনকি হৃদয়ের বাবার অগোচরে নিজের জীবনের শেষ সম্বল ভিটেমাটির জমিটুকু বন্ধক রেখে সেই টাকা তুলে দিয়েছিলেন হৃদয়ের হাতে। তবে ঢাকার বনশ্রীর একটি নামসর্বস্ব ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হয়ে নির্মম প্রতারণার শিকার হন তরুণ হৃদয়। সেই ধাক্কায় একসময় ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার কন্ডিশন তৈরি হয়েছিল তাঁর মনে। কিন্তু মায়ের সেই ত্যাগের মুখের দিকে তাকিয়ে এবং তাঁর ঋণ শোধ করার অدم্য জেদ নিয়ে আবারও মাঠে ফেরেন তিনি। যার পরের ইতিহাস আজ পুরো বিশ্ববাসীর জানা।
তাওহিদ হৃদয় মাঠের ক্রিকেটে যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, তাঁর পুরো পৃথিবীটা আবর্তিত হয় তাঁর মাকে ঘিরে। এর আগে একবার মায়ের শারীরিক কন্ডিশন খারাপ হওয়ায় জাতীয় দলের কড়া অনুশীলন ক্যাম্পের আইনি নিয়মকে একপাশে রেখে পুরোটা সময় হাসপাতালের বেডের পাশে কাটিয়েছিলেন তিনি। তখন গণমাধ্যমে নানা ধরণের গালগল্প বা গুঞ্জন রটেছিল, কিন্তু হৃদয় সেসবে কান না দিয়ে মায়ের সেবা করাকেই জীবনের প্রথম গেমপ্ল্যান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
বছর খানেক আগে মাকে লেখা হৃদয়ের একটি ‘খোলা চিঠি’ ভক্তদের হৃদয়ে দাগ কেটেছিল। ক্যানসারের সাথে লড়াইরত মাকে উদ্দেশ্য করে হৃদয় লিখেছিলেন:
“আমার মা, আমার জন্মদিনের দিন প্রথম খবর পাই তোমার ক্যানসার। সে দিন প্রথম বুঝতে পারলাম পুরো পৃথিবীর বিনিময়ে হলেও আমার তোমাকেই দরকার। এরপর তোমার সেই কষ্টের পুরোটা জার্নি ছিল আমার চোখের সামনে। তোমার ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে কত চোখের পানি ফেলেছি তার হিসাব নেই। তুমি ঘুম থেকে উঠে আমার চোখ ভেজা দেখবে বলে নিজেই আবার সেই চোখের পানি মুছেছি। তুমি ক্যানসারের সাথে লড়াই করেছো, আর আমি প্রতিনিয়ত তোমাকে হারানোর ভয়ের সাথে লড়াই করেছি। কিন্তু এই শক্তির পুরোটাই যে পেয়েছি তোমাকে দেখে মা। পরকালে মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত হলেও, এ দুনিয়ায় তোমার হাসিতে আমি বেহেশত দেখেছি। তুমি হাসি-খুশি থাকো, সুস্থ থাকো, প্রতিটি মোনাজাতে এটাই আমার সবথেকে বড় চাওয়া। ইতি তোমার বাবা।”
আজ মায়ের সেই কষ্টের দিনগুলো কিছুটা হলেও লাঘব করতে পেরেছেন হৃদয়। চেরি ব্র্যান্ডের সেই লাল গাড়িটি এখন কেবল একটি পুরস্কার নয়, এটি মায়ের জমি বন্ধক রাখার সেই কান্নার বিপরীতে এক সুপুত্রের দেওয়া রাজকীয় উপহার ও বিজয়ের নিরেট স্মারক।
জান্নাত সকালবেলা
|