মন্ত্রীর সহায়তায়ও শেষ রক্ষা হলো ন কাফনে মোড়ানো ছেলেকে নিয়ে ভোলার পথে মা

‘নাতি দুনিয়া ছাইড়া চলিয়া গেছে গো’, ফোনে দাদিকে সন্তানের মৃত্যু সংবাদ দিলেন বাবা

এডমিন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ০২:৫২ অপরাহ্ণ
মন্ত্রীর সহায়তায়ও শেষ রক্ষা হলো ন কাফনে মোড়ানো ছেলেকে নিয়ে ভোলার পথে মা

সন্তানের মরদেহ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে

আমেনা বেগম চেয়ারে হেলান দিয়ে প্রায় অচেতনের মতো বসে ছিলেন। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে আকাশফাটা আর্তচিৎকার করে উঠলেন, ‘বাবারে কিন্তু আমি বুকে নিয়া বাসায় যামু’। স্বজনেরা তাঁকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করলেও তাঁর বিলাপ থামছিল না। ‘আমি তো বাবারে এমনে আনি নাই, এখন এমনে কেমনে নিয়া যামু’, ‘বাবা তো আমার কাছে আর আসব না’—ছেলের শোকে এভাবেই বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন এই মা।

গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও হাম-পরবর্তী নানা জটিলতায় মারা যায় পাঁচ মাস বয়সী মো. তাকরিম। ভোলা জেলার বাংলাবাজার এলাকায় তাদের বাড়ি। মা আমেনা বেগম আর বাবা মো. মহসীনের এক মাসের দীর্ঘ লড়াই থামল এক বুক হাহাকার নিয়ে।

তাকরিমের বাবা মহসীন কাঁদতে কাঁদতে মুঠোফোনে নিজের মাকে জানাচ্ছিলেন, ‘মা, তোমার নাতিরে আল্লায় নিয়া গেছে গো, তোমার রুমে যাইয়া আর কান্না করব না তোমার নাতি।’ এক মাস আগে জ্বর, কাশি ও র্যাশ নিয়ে তাকরিমকে প্রথমে ভোলার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে দফায় দফায় চিকিৎসক দেখানো হলেও প্রকৃত রোগ ধরা পড়েনি।

মহসীন একটি গণমাধ্যমকে জানান, ভোলায় চিকিৎসকেরা তাঁর ছেলের হাম শনাক্ত করতে পারেননি। বারবার জিজ্ঞাসা করা সত্ত্বেও চিকিৎসকেরা একে ‘অ্যালার্জি’ বলে চিকিৎসা চালিয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “একটা বারও যদি হামের কথা বলত, তাইলে ছেলেরে আরও আগেই ঢাকায় নিয়া আসতাম। ডাক্তারের কাছে ১০০ বার জিজ্ঞেস করছি, শুধু বলছে অ্যালার্জি হইছে।”

অবস্থার অবনতি হলে তাকরিমকে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখানকার চিকিৎসকেরা প্রথম হাম ও হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়াসহ নানা জটিলতার কথা জানান। পরে পিআইসিইউ-এর প্রয়োজনে তাকে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

হাসপাতালটির সিনিয়র রেজিস্ট্রার মো. আব্দুর রাজ্জাক একটি গণমাধ্যমকে বলেন, শিশুটিকে হাম ও হাম-পরবর্তী জটিলতা নিয়ে একদম শেষ পর্যায়ে এখানে আনা হয়েছিল। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মৃত্যুসনদে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়া, রক্তে জীবাণুর সংক্রমণ, মস্তিষ্কে সংক্রমণ ও রক্তে পটাশিয়ামের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া শিশুটির হার্টে ছিদ্র ছিল।

তাকরিমের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। অটোরিকশা চালক বাবা মহসীন ছেলের চিকিৎসার খরচ মেটাতে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। গত মঙ্গলবার তাঁরা একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কেউ যদি চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় তবে তারা প্রয়োজনে সন্তানকেও দিয়ে দিতে রাজি আছেন। এই প্রতিবেদন দেখে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম শিশুটির চিকিৎসার সব দায়িত্ব নেন। মন্ত্রীর প্রতিনিধি চার লাখ টাকার বেশি বিল পরিশোধ করেন এবং পরিবারকে নগদ অর্থ সহায়তা দেন। এছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও বিলে এক লাখ টাকা ছাড় দেয়।

রাষ্ট্রীয় সহায়তা মিললেও শেষ পর্যন্ত সন্তানকে বাঁচাতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে বেলা আড়াইটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ভোলার পথে রওনা দেন এই দম্পতি। কাফনে মোড়ানো তাকরিমের নিথর দেহ তখন অ্যাম্বুলেন্সের পেছনের সিটে। মা আমেনা বেগম সামনের সিটে বসে বারবার পেছনের দিকে তাকাচ্ছিলেন, কিন্তু ছেলের মরদেহের দিকে সরাসরি তাকানোর শক্তি যেন তাঁর ছিল না।

তাকরিমের খালু কুদরতুল্লাহর অভিযোগ, ভোলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে হামের চিকিৎসা নিয়ে এক ধরনের নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা চলছে। তাঁর ভাগনে ভুল চিকিৎসার শিকার হয়েছে বলেই তিনি দাবি করেন। ৫ মাসের ছোট্ট তাকরিমের এই অকাল মৃত্যু দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে আবারও প্রকটভাবে সামনে নিয়ে এলো।

মন্তব্য করুন