ওয়াটার ব্রেকের আড়ালে ৫০০ মিলিয়ন ডলার আয়ের মেগা কৌশল ফিফার
স্পোর্টস ডেস্ক: বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাঠের তাপমাত্রা যখন পারদ চড়ে ১১০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন ফুটবলারদের চরম ডিহাইড্রেশন বা হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচাতে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA) প্রবর্তন করেছিল এক নতুন নিয়ম—‘ওয়াটার ব্রেক’। নিয়ম অনুযায়ী, মাঠের অতিরিক্ত তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে রেফারি প্রতি ম্যাচের দুই অর্ধে একবার করে মোট দুইবার ৩ মিনিটের জন্য খেলা থামিয়ে খেলোয়াড়দের পানি পানের সুযোগ করে দেন। আপাতদৃষ্টিতে একে কেবলই জীবনরক্ষাকারী এবং ফুটবলারদের স্বাস্থ্যের প্রতি ফিফার এক পরম মানবিক পদক্ষেপ মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক চতুর বাণিজ্যিক ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত হিসাব।
ভিতরের গাণিতিক সমীকরণটা আসলে কেমন? ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাটে মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিটি ম্যাচে দুইবার করে এই ৩ মিনিটের বিরতি যোগ করলে পুরো টুর্নামেন্টে মোট বিরতির সময় দাঁড়ায় প্রায় ১০ ঘণ্টারও বেশি (৬২৪ মিনিট)। আর বিশ্বকাপের মতো বিশ্বমঞ্চের মহা-আসরে, যেখানে ম্যাচের মাঝে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের একটি স্লট বা বিজ্ঞাপনের মূল্য প্রায় সাড়ে সাত লাখ মার্কিন ডলার, সেখানে এই বাড়তি ১০ ঘণ্টার লাইভ সম্প্রচার বিরতির মোট বাণিজ্যিক মূল্য গিয়ে ঠেকছে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি)!
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, আমেরিকার বিখ্যাত স্পোর্টস ব্রডকাস্টার ‘ফক্স নেটওয়ার্ক’ (Fox Network) পুরো টুর্নামেন্ট আমেরিকার মাটিতে সম্প্রচারের জন্য যে মূল স্বত্ব বা ব্রডকাস্ট রাইটস কিনেছিল, ফিফার এই চতুর ওয়াটার ব্রেকের বিজ্ঞাপনী আয় তার চেয়েও অনেক বেশি। বিশ্লেষকরা একে আমেরিকান বাস্কেটবল (NBA) বা আমেরিকান ফুটবলের (NFL) মতো বাণিজ্যিকীকরণের ফুটবল সংস্করণ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
তবে এই রূপকথার মতো গল্পটা শুধু কাড়ি কাড়ি টাকা আয়ের নয়; বরং এটি ফুটবলের দেড়শ বছরের চিরন্তন ব্যাকরণকে চিরতরে বদলে দেওয়ার গল্পও বটে। সনাতন ও ঐতিহ্যবাহী ফুটবলে ক্রিকেটের ড্রিংকস ব্রেক বা বাস্কেটবলের মতো কোনো ‘টাইমআউট’ কিংবা অফিশিয়াল কৌশলগত বিরতি থাকে না। ৯০ মিনিটের তীব্র লড়াইয়ে একজন কোচকে সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে কেবল চিৎকার করেই বা হাত নেড়েই ট্যাকটিক্যাল নির্দেশনা দিতে হতো।
কিন্তু এখন এই তিন মিনিটের ‘ওয়াটার ব্রেক’-এর সুবাদে খেলোয়াড়রা যখন সাইডলাইনে কোচের ডাগআউটের কাছে ছুটে যান, তখন তারা শুধু পানিই পান করেন না; বরং কোচের দেওয়া বোর্ডের চকবোর্ডে পুরো দলের রণকৌশল নতুন করে রি-অ্যারেঞ্জ বা সাজিয়ে নেওয়ার এক গোল্ডেন সুযোগ পান।
মাঠের বাস্তবতায় এটি এখন প্রতিপক্ষের তৈরি হওয়া আক্রমণের ধার বা চমৎকার ছন্দকে এক ঝটকায় ভেঙে দেওয়ার এক মোক্ষম মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়া দলগুলো এই ৩ মিনিটে নিজেদের ভুল শুধরে চাঙ্গা হয়ে উঠছে, যা অনেক সময় ম্যাচের ভাগ্য সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিচ্ছে। মানবিকতার মোড়কে ঢাকা ফিফার এই ৩ মিনিটের ব্রেক তাই একই সাথে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা এবং আধুনিক ফুটবলের নতুন দাবার চাল।
|