কিশোরগঞ্জে পুলিশের হাতে আটক মাদকের ৩ আসামিকে ছেড়ে দিলেন ইউএনও
বিশেষ প্রতিনিধি, কিশোরগঞ্জ: কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে পুলিশের বিশেষ সাঁড়াশি অভিযানে মাদকসহ আটককৃত তিনজনকে মোবাইল কোর্টে শাস্তির আওতায় না এনে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাফফাত আরা সাঈদের বিরুদ্ধে।
একই অভিযানে মাদকসহ আটক ইসমাইল মিয়াকে মোবাইল কোর্টে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ছেড়ে দেওয়া তিনজন হলেন—কুলিয়ারচর উপজেলার পূর্ব গোবরিয়া গ্রামের ফারুক মিয়ার ছেলে সিয়াম (১৮), লক্ষ্মীপুর গ্রামের সাফি মিয়ার ছেলে সানি (২৭) এবং একই গ্রামের সেনু মিয়ার মেয়ে বকুলা বেগম (৩৫)। বকুলা বেগম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ইসমাইল মিয়ার স্ত্রী।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বুধবার দিবাগত রাতে কুলিয়ারচর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। অভিযানে মাদক সেবন ও মাদক রাখার অভিযোগে বিভিন্ন স্থান থেকে মোট আটজনকে আটক করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ব গোবরিয়া গ্রামের সিয়াম ও লক্ষ্মীপুর গ্রামের সানিকে প্রায় ৫০০ গ্রাম মদ ও বোতলসহ মাদকাসক্ত অবস্থায় আটক করা হয়। পরে তাঁদের মোবাইল কোর্টে নেওয়া হলে সেখানে তাঁরা মাদক সেবনের কথা স্বীকার করেন বলে জানা গেছে। এরপর তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া মদ জনসম্মুখে ধ্বংস করা হয় এবং মুচলেকা নিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে লক্ষ্মীপুর গ্রামের ইসমাইল মিয়া (৫০) ও তাঁর স্ত্রী বকুলা বেগমকে তাঁদের নিজ বাড়ি থেকে মাদকসহ আটক করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁদের ঘর থেকে ১১ পিস ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার করা হয়। তবে ওই ঘটনায় ইসমাইল মিয়াকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাঁকে আরও সাত দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে তাঁর স্ত্রী বকুলা বেগমকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর ৭ (২) ধারায় বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি অভিযোগ স্বীকার করলে তাঁর স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করে যথোপযুক্ত দণ্ড আরোপের লিখিত আদেশ দিতে হবে। আর ৭ (৩) ধারায় অভিযোগ অস্বীকার করে দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক হলে তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে মাদক সেবনের অভিযোগ স্বীকার করার পর সিয়াম ও সানিকে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিধানের অধীনে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযানে আটক অপর চারজনকে কিশোরগঞ্জের বিজ্ঞ আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
একই অভিযানে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এভাবে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রশ্ন, মাদক সেবনের কথা স্বীকার করার পর মদসহ আটক সিয়াম ও সানিকে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হলেও মাদক রাখার অভিযোগে ইসমাইল মিয়াকে কেন কারাদণ্ড দেওয়া হলো! একই ঘটনায় ইসমাইলের স্ত্রী বকুলা বেগমকে ছেড়ে দেওয়ার আইনগত ভিত্তিই বা কী ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, কুলিয়ারচরে মাদকের বিস্তার দীর্ঘদিনের একটি বড় সামাজিক সমস্যা। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের অভিযানে মাদকসহ আটকের পর কারও বিরুদ্ধে কারাদণ্ড, কারও বিরুদ্ধে আদালতে প্রেরণ এবং কারও ক্ষেত্রে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়ার মতো ভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হলে তার কারণ ও আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাফফাত আরা সাঈদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হয়। শুক্রবার সরকারি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ও মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এআইএল/সকালবেলা