দিরাইয়ে আধুনিক মৎস্য কেন্দ্র: হাওরাঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা

প্রকাশ: শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৪ অপরাহ্ণ
দিরাইয়ে আধুনিক মৎস্য কেন্দ্র: হাওরাঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা

অনক আলী হোসেন শাহিদী: হাওরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য উৎপাদনকারী জেলা সুনামগঞ্জ। প্রতিবছর এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ হলেও আধুনিক অবতরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার অভাবে জেলেদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি, মাছের গুণগত মান সংরক্ষণ এবং আহরণোত্তর অপচয় দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতা বিবেচনায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) বাস্তবায়ন করছে “সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলায় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র স্থাপন (২য় সংশোধিত)” শীর্ষক প্রকল্প।

প্রকল্পটি জুলাই ২০২১ থেকে বাস্তবায়নাধীন। মূল মেয়াদ জুন ২০২৬ পর্যন্ত হলেও কাজ সম্পন্নের লক্ষ্যে জুন ২০২৭ পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ২৯৪৪ লাখ টাকা এবং এটি পুরাতন সুরমা নদীর তীরে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যভাণ্ডার। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ৩৭৩টি হাওর প্রায় ৮ লাখ ৫৯ হাজার হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এসব অঞ্চলে উৎপাদিত মাছের নিরাপদ অবতরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করাই প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক HACCP মান অনুসরণ করে আধুনিক মৎস্য বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পটির প্রধান লক্ষ্য হলো উন্নতমানের অবতরণ ও বিপণন সুবিধার মাধ্যমে নিরাপদ ও রাসায়নিকমুক্ত মাছ সরবরাহ নিশ্চিত করা। এর আওতায় আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র স্থাপন, মাছ সংরক্ষণ ও বাজারজাত ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিশেষ করে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং কাজে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আহরণকৃত মাছের প্রায় ৪০ শতাংশ আহরণোত্তর অপচয় কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ৬৮ হাজার মেট্রিক টন মাছ স্বাস্থ্যসম্মতভাবে অবতরণ ও প্যাকিং, ৪ হাজার ৫০ মেট্রিক টন বরফ উৎপাদন, ৮১০ মেট্রিক টন মাছ হিমায়ন, ২৫২ মেট্রিক টন নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদন এবং ৬ হাজার মেট্রিক টন মাছ সংরক্ষণের সুবিধা সৃষ্টি হবে। বাস্তবায়নোত্তর পর্যায়ে নতুন জনবল নিয়োগেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রকল্প এলাকায় ভূমি উন্নয়ন, ১৯ হাজার ৫০০ বর্গফুটের দ্বিতল মাল্টিপারপাস ভবন, ১৫ টন ক্ষমতাসম্পন্ন বরফকল, বরফকল ভবন ও মেশিন রুম, চারটি গ্রিনহাউজ মেকানিক্যাল ড্রায়ার, চারটি সৌরচালিত মিনি-গ্রিড ড্রায়ার, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন, জেনারেটর এবং সীমানা প্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য ৭ ৬৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত এ অর্থবছরে ৪৮৭.১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। একই সময় পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৬৩.৪২ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৮০ শতাংশ। অপরদিকে শুরু থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে ১৬২২.৬৯ লাখ টাকা; সামগ্রিক আর্থিক অগ্রগতি ৫৫.১১ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৬০ শতাংশ।

প্রকল্পের বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজের মধ্যে সীমানা প্রাচীর, ভূমি উন্নয়ন, বরফকল ও মেশিন রুম, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন, গভীর নলকূপ, স্বাস্থ্যবিধি ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, ট্রাক পার্কিং এলাকা, গ্রিনহাউজ ড্রায়ার, সৌরচালিত ড্রায়ার, সৌর প্যানেল, আসবাবপত্র ও কম্পিউটার সংগ্রহসহ একাধিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। মাল্টিপারপাস ভবনের কাঠামোগত নির্মাণ শেষ হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার কাজ চলমান রয়েছে। অন্যদিকে ১৫ টন ক্ষমতাসম্পন্ন বরফকল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ক্রয় ও স্থাপনের জন্য ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং মূল্যায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে নির্মাণকাজ ব্যাহত হয়। বর্ষাকালে প্রকল্প এলাকা পানিতে নিমজ্জিত থাকায় অনেক সময় উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ পরিচালনা সম্ভব হয় না, ফলে প্রকল্পের অগ্রগতিতে প্রভাব পড়ে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত মাছের নিরাপদ অবতরণ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এর মাধ্যমে মাছের গুণগত মান রক্ষা, আহরণোত্তর অপচয় হ্রাস, জেলেদের আয় বৃদ্ধি, নারী কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ মৎস্য সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র।

প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মোঃ ইসানুল হক বলেন, “দিরাই উপজেলায় নির্মাণাধীন আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি বাস্তবায়িত হলে হাওরাঞ্চলের মৎস্য খাতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মাছ অবতরণ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে আহরণোত্তর অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, জেলেরা তাদের উৎপাদিত মাছের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং স্থানীয়ভাবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করে জনগণের জন্য এর সুফল নিশ্চিত করতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি।”

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ দেলোয়ার হোসেন বলেন, “হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে মৎস্য খাত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দিরাইয়ে আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে মাছের নিরাপদ অবতরণ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের একটি আধুনিক অবকাঠামো গড়ে উঠবে। এতে জেলেরা তাদের উৎপাদিত মাছের ন্যায্যমূল্য পাবেন, আহরণোত্তর অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের মৎস্য খাতের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে হাওরাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জাতীয় মৎস্য উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার আরও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোঃ আমিন উর রশিদ বলেন, “হাওরাঞ্চলের বিপুল মৎস্যসম্পদ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি এবং অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিরাইয়ে আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে মাছের নিরাপদ অবতরণ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে একটি আধুনিক ও টেকসই ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এতে জেলেরা ন্যায্যমূল্য পাবেন, আহরণোত্তর অপচয় কমবে, কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং দেশীয় ও রপ্তানিমুখী মৎস্য খাত আরও শক্তিশালী হবে। সরকার মৎস্য খাতের আধুনিকায়ন, জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন এবং নিরাপদ মাছ ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে এ ধরনের উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।”

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন