গাজীপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের অনিয়ম-দুর্নীতি থামবে কবে

প্রকাশ: শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৮ অপরাহ্ণ
গাজীপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের অনিয়ম-দুর্নীতি থামবে কবে

রেজাউল করিম মজুমদার, গাজীপুর: গাজীপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের শেষ কোথায়—এই প্রশ্ন এখন ভূক্তভোগী সেবাপ্রার্থীদের। প্রতিবছর নিয়ম অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক অডিট করার বিধান থাকলেও দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এই দুটি অফিসে কোনো অডিট হয় না। আর এই অডিটহীনতার সুযোগে গড়ে উঠেছে এক বিশাল দুর্নীতি ও অনিয়মের সাম্রাজ্য।

জেলা ও সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ বাণিজ্য, অতিরিক্ত ফি আদায় এবং দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চরমে পৌঁছেছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন জেলা রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান, সদর সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেন, সাবেক যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলম এবং উমেদার সোহেল, কাশেম, রিপন ও রাব্বি।

জেলা রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান ও সদর সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেনের বিরুদ্ধে দলিল নিবন্ধনে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে সুনির্দিষ্টভাবে অতিরিক্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক অডিট না থাকায় এসব অনিয়ম এখন প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে দলিলের মূল্য কম-বেশি দেখানো, জমির শ্রেণি পরিবর্তন ইত্যাদির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রেকর্ড রুমে প্রতিনিয়ত চলছে লাখ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন।

সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে প্রতিটি দলিলে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জমির শ্রেণি ও বাজারমূল্য কম দেখিয়ে নেওয়া হয় বড় অঙ্কের ঘুষ। এছাড়া অফিস স্থানান্তর বা আনুষঙ্গিক খরচের অজুহাতেও অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ আদায় করার অভিযোগ উঠেছে। দলিল লেখক সমিতির রেজুলেশনে পাওয়া তথ্যমতে, সাবেক যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের সময়কালে অফিস স্থানান্তরের নামে ৪৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত গ্রহণ করা হয়েছিল।

রেকর্ড রুম ও নকল তোলার জন্য রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০টি আবেদন জমা হয়, যা থেকে মাস শেষে প্রায় ৯০ লাখ টাকার অবৈধ ঘুষ লেনদেন হয়। সেবা পেতে সরাসরি জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় বা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গেলে নানা বাহানায় ফাইল আটকে রাখা হয়। অন্যদিকে পুরনো বালাম বই বের করার জন্য সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। সাধারণ মানুষ দালালের মাধ্যমে না গেলে মাসের পর মাস ঘুরেও নকল দলিল হাতে পান না।

মূলত সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দলিল রেজিস্ট্রি ও নামজারির কাজ চালানো হচ্ছে। নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট ও ভেন্ডার সমিতির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় ঘুষের টাকা। অফিস কক্ষ থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের খাস কামরায় বহিরাগত দালালদের অবাধ যাতায়াত লক্ষ্য করা যায়। নকল ও সার্টিফাইড কপির জন্য নির্ধারিত ফির চেয়ে কয়েক গুণ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা পকেটস্থ করা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে কর্মকর্তা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, অফিসের প্রতিটি টেবিলেই রয়েছে ঘুষের নির্দিষ্ট রেট। এর আগে মারিয়ালীতে রেকর্ড রুম স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধে দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষ সেবাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।

অফিস স্টাফ ও দালালদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুরো অফিসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মনিরুলের সহযোগী হিসেবে পরিচিত উমেদার সোহেলসহ কাশেম, রিপন ও রাব্বি খাস কামরার কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করে বেপরোয়া অর্থ আদায় করে চলেছেন।

উল্লেখ্য, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের অভিযানে পূর্বে প্রায় ১৩ কোটি টাকার অডিট আপত্তি ও নানা অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুনির্দিষ্ট দলিল নম্বরসহ একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও ব্যবস্থা গ্রহণের গতি অত্যন্ত ধীর। গণমাধ্যমে দুর্নীতির প্রমাণ ও ভিডিও প্রকাশিত হলেও নেওয়া হয় কেবল নামমাত্র তদন্তের উদ্যোগ। স্থানীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে সেবাপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে।

ভুক্তভোগী সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা অবিলম্বে এই অনৈতিক সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে অফিস দুটিকে পুরোপুরি দালালমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দুর্ভোগ কমাতে ডিজিটাল ফাইলিং, দলিলের স্বচ্ছ ফি কাঠামো নিশ্চিত করা এবং অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এখন জরুরি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা কেটে দেন। অন্যদিকে গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমানের সহকারী ফোন রিসিভ করে জানান, "স্যার ব্যস্ত আছেন, পরে কল করে কথা বলিয়ে দিচ্ছি।" তবে পরবর্তীতে একাধিকবার চেষ্টা করেও জেলা রেজিস্ট্রারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন