৩ মাসের জন্য বন্ধ হলো সুন্দরবনের দুয়ার

প্রকাশ: রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৩:০৬ অপরাহ্ণ
৩ মাসের জন্য বন্ধ হলো সুন্দরবনের দুয়ার
নিজস্ব ডেস্ক : বিশ্ব ঐতিহ্য ও বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বনজ সম্পদ, মৎস্য ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিতকরণ, সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বন্য প্রাণীর অবাধ ও সুরক্ষিত বিচরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আগামী তিন মাসের জন্য সুন্দরবনের দুয়ার সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ১ জুন থেকে শুরু হয়ে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত টানা তিন মাস সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সব ধরনের মৎস্য ও কাঁকড়া আহরণ, বনজীবীদের মধু সংগ্রহ এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ বা প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। ইতোমধ্যে সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় লোকালয় ও চরাঞ্চলগুলোতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে বিশেষ মাইকিং করে এই সতর্কবার্তা ও সরকারি নির্দেশনার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আজ রবিবার (৩১ মে) দুপুর ২টা ০৬ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘সারাদেশ’ বিভাগের এক বিশেষ প্রতিবেদনে সুন্দরবনের এই বার্ষিক নিষেধাজ্ঞা এবং এর ফলে উপকূলীয় বনজীবী মানুষের জীবনযাত্রার সংকটের চিত্র বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।

বন বিভাগের পক্ষ থেকে এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারির পর সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার হাজার হাজার জেলে, বাওয়ালী, মৌয়াল ও সাধারণ বনজীবী পরিবারের মাঝে চরম দুশ্চিন্তা ও হতাশার ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগী জেলেদের দাবি, বছরের এই তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় তাদের প্রাত্যহিক আয়-রোজগারের একমাত্র পথটি একবারে রুদ্ধ হয়ে যায়। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় এই দীর্ঘ সময় ধরে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে অনেককে চড়া সুদে ঋণ করে বা দাদন নিয়ে সংসার চালাতে হয়। ফলে তারা স্থানীয় মহাজনসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে দীর্ঘমেয়াদী ধারদেনায় জড়িয়ে পড়েন। বনজীবীদের প্রধান ক্ষোভ, এই দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার সময়ে তারা সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত বা সময়োচিত কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর খাদ্য সহায়তা পান না, যার কারণে তাদের চরম অনাহার ও অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে অবিলম্বে বিশেষ খাদ্য সহায়তা ও আর্থিক প্রণোদনার জোর দাবি জানিয়েছেন কর্মহীন হয়ে পড়া উপকূলীয় বনজীবীরা।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জুন থেকে আগস্ট— এই তিন মাস সুন্দরবনের নদী-খালে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, জলজ প্রাণী এবং বনের অন্যান্য স্তন্যপায়ী বন্য প্রাণীর প্রধান প্রজনন মৌসুম (Breeding Season) হিসেবে গণ্য করা হয়। এই সময়ে বনের নদী ও খালের অধিকাংশ মাছ ও জলজ প্রাণী ডিম ছাড়ে। একই সঙ্গে বর্ষার এই আবহাওয়ায় বনের অমূল্য উদ্ভিদরাজির স্বাভাবিক পুনরজন্ম ও চারা গজানোর প্রক্রিয়া প্রাকৃতিকভাবে চলতে থাকে। তাই বনের এই প্রাকৃতিক বিকাশ এবং বন্য প্রাণীর নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতেই প্রতি বছরের মতো এবারও তিন মাসের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে।

এই নিষেধাজ্ঞা শতভাগ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে জেলে, মৌয়াল ও পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য নতুন পাশ বা পারমিট (অনুমতিপত্র) দেওয়া ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আগামী ১ জুন থেকে নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার আগেই বনের ভেতরে অবস্থানরত সকল জেলে ও বাওয়ালিদের বন এলাকা ত্যাগ করে লোকালয়ে ফিরে আসার জন্য কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে বন বিভাগ।

বন বিভাগের দেওয়া ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় সর্বপ্রথম ২০১৯ সালে এই বিশেষ মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা চালু করা হয়। শুরুতে এর মেয়াদ ছিল মাত্র দুই মাস। পরবর্তীতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের বার্ষিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সমন্বয় করে সুন্দরবনের এই নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা বাড়িয়ে তিন মাস করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সাল থেকে প্রতি বছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে মাছ ধরা, মধু সংগ্রহ, পর্যটন কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশে এই অভিন্ন নিষেধাজ্ঞা নিয়মিত কার্যকর হয়ে আসছে।

সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম এই বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, “বনের নিয়ম অনুযায়ী গত ২৪ মে থেকেই আমরা নতুন করে কোনো পাশ বা অনুমতিপত্র দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তবে দীর্ঘ তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ থাকায় উপকূলীয় দরিদ্র জেলে ও বনজীবী পরিবারগুলোর যে চরম মানবিক দুর্ভোগ তৈরি হয়, সেটির কথা বিবেচনা করে তাদের জন্য বিশেষ খাদ্য সহায়তা এবং সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আমরা ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। সেখান থেকে দ্রুত অনুমোদন পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে এই সহায়তা বন্টন করা হবে।”

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেডএম হাছানুর রহমান বনের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে বলেন, “জলজ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন সক্ষমতা এবং বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বৃদ্ধি করতেই প্রতি বছর এই রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তাই এই সময়ে কোনো অবস্থাতেই কাউকে সুন্দরবনের সীমানায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের রুখতে বনের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে স্পিডবোট ও ট্রলারের মাধ্যমে বিশেষ টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।” তবে এই বিশাল ও দুর্গম বনের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় শুধু বন বিভাগ নয়, বরং স্থানীয় জনমানুষ ও সুশীল সমাজের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

জান্নাত সকালবেলা