বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এক অনিশ্চিত সময় অতিক্রম করছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য প্রবাহ এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। একদিকে ইরান, ইসরায়েল, বাহারাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—অন্যদিকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান—এই বিস্তৃত অস্থিরতা কেবল সামরিক বা কূটনৈতিক ইস্যু নয়; বরং এর সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশের অর্থনীতি বিচ্ছিন্ন নয়। ফলে একটি অঞ্চলের সংঘাত দ্রুতই বৈশ্বিক বাজারে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তার অভিঘাত আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয়।
বাংলাদেশ গত এক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবুও আমাদের অর্থনীতির একটি বড় অংশ আমদানি-নির্ভর। জ্বালানি তেল, এলএনজি, রাসায়নিক সার, গম, ভোজ্য তেলসহ নানা কৃষি উপকরণ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে বৈশ্বিক অস্থিরতা দেখা দিলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের কৃষি উৎপাদন ব্যয়, বাজারমূল্য এবং খাদ্য নিরাপত্তায়।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র। এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি কৃষির ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের কৃষি বিশেষত সেচনির্ভর ধান উৎপাদন জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ডিজেলচালিত সেচ পাম্প, জমি প্রস্তুতের যন্ত্র, ফসল কাটার হারভেস্টার এবং পরিবহন ব্যবস্থার খরচ জ্বালানির দামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয় এবং এর প্রতিফলন ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্যের দামে পড়ে।
বাংলাদেশে বোরো মৌসুমে সেচের প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক। যদি জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে সেচ ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকের লাভের পরিমাণ কমে যাবে। কৃষক যখন উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য মূল্য পান না, তখন তাদের উৎপাদন আগ্রহ হ্রাস পায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি খাদ্য উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি শহর ও গ্রামের নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
রাসায়নিক সার বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপাদান। ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি—এসব সারের উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে অথবা মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে। সারের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় এবং কৃষকের জন্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত না হলে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এছাড়া কৃষি যন্ত্রাংশ, কীটনাশক ও উন্নত বীজের ক্ষেত্রেও আমদানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হলে এসব উপকরণ সময়মতো পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কৃষক প্রয়োজনীয় সময়ে উৎপাদন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
কৃষি বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত। গ্রামীণ অর্থনীতি কৃষিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কৃষকের আয় কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে স্থানীয় বাজার, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ওপর। সুতরাং কৃষিতে ব্যয় বৃদ্ধি কেবল খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি নয়; বরং সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে।
বৈদেশিক বাণিজ্যের দিক থেকেও পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে এবং সেই মুদ্রা দিয়ে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য আমদানি করে। যদি বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে রপ্তানি বাজারে চাহিদা কমে যায়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয়ের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। ঐ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে কৃষি ভর্তুকি ও আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সরকারের ওপর চাপ বাড়বে।
এই বাস্তবতায় আমাদের কৃষি খাতকে আরও টেকসই ও স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা অপরিহার্য।
প্রথমত, আমদানি নির্ভরতা কমাতে স্থানীয়ভাবে সার উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জৈব সার ও বায়োফার্টিলাইজার ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, সৌরশক্তিচালিত সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা যেতে পারে। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার কৃষিকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও ব্যয় সাশ্রয়ী করতে সহায়ক হবে।
তৃতীয়ত, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জলবায়ু সহনশীল, কম পানি ও কম সারের প্রয়োজন হয় এমন জাত উদ্ভাবনে জোর দেওয়া জরুরি। গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে কার্যকর সম্প্রসারণ ব্যবস্থার বিকাশ প্রয়োজন। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনা উৎপাদন খরচ কমাতে এবং ফলন বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে স্থানভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রমকে আরো জোরদার করতে হবে।
চতুর্থত, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে উৎপাদিত ফসলের একটি অংশ সঠিক সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে নষ্ট হয়। আধুনিক গুদাম, সাইলো এবং কোল্ড স্টোরেজ সম্প্রসারণ করলে খাদ্য অপচয় কমবে এবং সংকটকালে রিজার্ভ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বিকাশ লাভ করলে মূল্য সংযোজন ও রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়বে।
পঞ্চমত, কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করলে উভয়পক্ষই উপকৃত হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাজার তথ্য সহজলভ্য করা যেতে পারে।
ষষ্ঠত, কৌশলগত খাদ্য মজুত নীতি শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত সরকারি মজুত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার সময় দেশীয় বাজারকে স্থিতিশীল রাখা সহজ হয়। একই সঙ্গে বহুমুখী ফসল উৎপাদনে উৎসাহ প্রদান করলে নির্দিষ্ট একটি ফসলের ওপর অতিনির্ভরতা কমবে।
সপ্তমত, চলমান বোরো মৌসুমের ফসল নির্বিঘ্নে ঘরে তোলার লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে বিদ্যমান হারভেস্টারসমূহ সচল ও কার্যকর রাখতে হবে এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করতে হবে, যাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং ফসল কর্তন ও সংগ্রহ পর্যায়ে অপচয় হ্রাস করা সম্ভব হয়।
বৈশ্বিক অস্থিরতা আমাদের জন্য এক সতর্কবার্তা। অতীতে বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকট আমাদের দেখিয়েছে যে খাদ্য নিরাপত্তা ও জ্বালানি নিরাপত্তা পরস্পর সম্পর্কিত। কৃষিকে শক্তিশালী না করলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না। তাই কৃষিতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ধান উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও বাজারমুখী কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন। কৃষি ও শিল্পের সমন্বিত বিকাশ নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনীতির ভিত আরও মজবুত হবে।
সবশেষে বলা যায়, বিশ্ব রাজনীতির টানাপোড়েন আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও তার প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তোলা আমাদের হাতে। কৃষিকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী, টেকসই ও স্বনির্ভর অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারলে বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাকতে পারবে। সংকটের এই সময়ে আমাদের কৃষি ভাবনা হতে হবে বাস্তবভিত্তিক, গবেষণানির্ভর এবং দূরদর্শী। কারণ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার যুগে কৃষিই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা, সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভবিষ্যৎ।
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং
প্রকল্প পরিচালক, এলএসটিডি প্রকল্প
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট
গাজীপুর -১৭০১