চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের আয় বেড়ে ২০৬৬ কোটি
অনলাইন ডেস্ক: দেশের সাধারণ যাত্রী পরিবহন খাত থেকে ধারাবাহিক রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর ভর করে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের মোট বার্ষিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৬৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। তবে উল্টো পিঠে তীব্র লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন সংকটের কারণে অত্যন্ত লাভজনক পণ্য পরিবহন খাতে সংস্থাটির আয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা হ্রাস পেয়েছে।
আজ রোববার (১৯ জুলাই) বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) আনিসুর রহমান সংস্থাটির সার্বিক আয়-ব্যয়ের এই সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য গণমাধ্যমের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন।
রেলওয়ের প্রকাশিত প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় এই যোগাযোগ সংস্থাটির মোট বার্ষিক আয় ছিল ১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রেলের মোট আয় বেড়েছে ২২১ কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল প্রবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে যাত্রী পরিবহন খাত, যেখানে আগের অর্থবছরের তুলনায় যাত্রী সমাগম বাড়ায় রাজস্ব আয় এক লাফেই বেড়েছে ২৫৬ কোটি টাকা।
তবে পণ্য খাতে ধাক্কা লাগার পাশাপাশি ভেন্ডিং লাইসেন্স, নানামুখী বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ উৎস মিলিয়ে পরিবহন ও বাণিজ্যিক খাতের রাজস্বও প্রায় ২৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা কমেছে। অবশ্য কয়েকটি অনাবাসিক খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে রেলওয়ে। এর মধ্যে রেলওয়ের বিশাল ভূসম্পত্তি ব্যবস্থাপনা থেকে আয় বেড়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা এবং রেললাইনের পাশ দিয়ে যাওয়া অপটিক্যাল ফাইবার লিজ বা ইজারা দিয়ে আয় বেড়েছে ১১ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
রেলওয়ের চূড়ান্ত হিসাবে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির মোট পরিচালন ব্যয়—যার মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন, রেলপথ ও রোলিং স্টকের নিয়মিত কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত—তা দাঁড়িয়েছে মোট ৩ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। এর ফলে ব্যয় ও আয়ের সামগ্রিক অনুপাত বা ‘অপারেটিং রেশিও’ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৯১, যা আগের অর্থবছরের ২ দশমিক ৯-এর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, অর্থাৎ রেলের আর্থিক স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতি বছর প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বিশাল পেনশন ব্যয়কে মূল পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত করায় রেলের প্রকৃত বাণিজ্যিক আর্থিক চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন ও নেতিবাচক দেখায়। রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী এই বিশেষ পেনশন ব্যয়টুকু বাদ দিলে প্রকৃত পরিচালন ব্যয় নেমে আসে প্রায় ২ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকায় এবং সেক্ষেত্রে অপারেটিং রেশিও আরও উন্নত হয়ে দাঁড়ায় মাত্র ১ দশমিক ৪৩।
সংস্থাটি ওনাদের বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি রাষ্ট্রীয় গণপরিবহন ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিপুল ভর্তুকিনির্ভরতা ও অতি রেয়াতি (ছাড়) ভাড়ায় জনগণকে সেবা দিয়ে আসছে। বিগত ২০১৬ সালের পর থেকে দীর্ঘ এক দশকে দেশে যাত্রীভাড়া আর নতুন করে বাড়ানো হয়নি। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে রেলের কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, আমদানিনির্ভর বিভিন্ন ভারী যন্ত্রাংশের মূল্য, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিনিময় হার, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং দেশের অন্যান্য সড়ক বা নৌ পরিবহন ব্যবস্থার ভাড়ার তুলনামূলক চিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যাত্রীভাড়া যদি যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্ধারণ করা যায়, তবে রেলের এই আয়-ব্যয়ের ব্যবধান বা ঘাটতি আরও দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তাই দেশের অন্যতম বৃহৎ এই সেবামূলক সংস্থাকে কেবল একটি ‘লোকসানি প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে একপাক্ষিক মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না বলেও বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে।
|