শুধু ‘কবুল’ নয়, যেসব শব্দেও বিয়ে সম্পন্ন হতে পারে

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ০৩:৪৯ অপরাহ্ণ
শুধু ‘কবুল’ নয়, যেসব শব্দেও বিয়ে সম্পন্ন হতে পারে

লাইফস্টাইল ডেস্ক : ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিতে বিয়ে বা ‘নিকাহ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র একটি ইবাদত এবং একই সাথে একটি দৃঢ় সামাজিক বন্ধন। এটি কেবল একজন নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈধ আইনি ও শারীরিক সম্পর্কই প্রতিষ্ঠা করে না, বরং একটি আদর্শ পরিবার গঠন, মানব চরিত্র সংরক্ষণ এবং সমাজে শৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখতে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে। এই কল্যাণকর দিকগুলোর কারণেই ইসলাম ধর্মে বিয়েকে অত্যন্ত উৎসাহিত করা হয়েছে এবং সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের দ্রুত বিয়ের পিঁড়িতে বসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেল ২টা ৫৬ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘লাইফস্টাইল’ ও ‘ইসলামি জীবনবিধান ও পারিবারিক আইন’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার নানাবিধ শব্দ ও ধর্মীয় শর্তাবলি বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

পবিত্র হাদিস শরিফে বিয়ের গুরুত্ব ও ফজিলত অনন্যভাবে বর্ণিত হয়েছে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, বিয়ে মানুষের দ্বীনের (ধর্মের) একটি বড় অংশ পূর্ণ করে দেয়। অন্য একটি বিখ্যাত হাদিসে তিনি বিশ্বজুড়ে যুবকদের উদ্দেশে বলেছেন—যাদের শারীরিক ও আর্থিক বিয়ের সামর্থ্য রয়েছে, তাদের দ্রুত বিয়ে করা উচিত। কারণ সঠিক সময়ে বিয়ে মানুষের চোখের দৃষ্টি ও ব্যক্তিগত চরিত্রকে পাপাচার থেকে পবিত্র ও সংযত রাখতে সরাসরি সহায়তা করে।

তবে বিয়ের এই পবিত্র আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রায়শই একটি বড় প্রশ্ন দেখা যায়; তা হলো—নিকাহ বা আকদ সম্পন্ন হওয়ার সময় পাত্র ও পাত্রীকে কি অবধারিতভাবে শুধুমাত্র ‘কবুল’ শব্দটিই মুখে উচ্চারণ করতে হবে? এই শব্দ ছাড়া অন্য কিছু বললে কি বিয়ে ভেঙে যাবে বা অশুদ্ধ হবে? ইসলামি আইনশাস্ত্র ও ফিকহ শাস্ত্রের গভীর আলোচনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি কেবল একটি সুনির্দিষ্ট বা সংকীর্ণ শব্দের ফ্রেমে সীমাবদ্ধ নয়।

মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান হানাফি ফিকহ (Hanafi Fiqh) বা ইসলামি আইনশাস্ত্র অনুযায়ী, একটি বিয়ে ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও বৈধ হওয়ার জন্য মূল শর্ত হলো—উভয় পক্ষের মধ্যে ‘ইজাব’ (বিয়ের স্পষ্ট প্রস্তাব) এবং ‘কবুল’ (সেই প্রস্তাবের সন্তোষজনক গ্রহণ) থাকতে হবে। তবে এই গ্রহণযোগ্যতা বা সম্মতি প্রকাশের জন্য মুখে হুবহু ‘কবুল’ শব্দ ব্যবহার করাই একমাত্র বা প্রধান আইনি শর্ত নয়। বরং এমন যেকোনো সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট শব্দ বা বাক্য, যা বিয়ের প্রস্তাবকে আনন্দের সাথে লুফে নেওয়ার বা গ্রহণের সঠিক অর্থ প্রকাশ করে, তা দিয়েই নিকাহ আইনিভাবে বৈধ হয়ে যায়।

ইসলামের প্রাচীন ও নির্ভরযোগ্য ফিকহের কিতাবগুলোতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, বিয়ের মজলিশে ‘কবুল’ শব্দের সমার্থক হিসেবে পরিস্থিতিভেদে নিচের শব্দ বা বাক্যগুলো উচ্চারণ করলেও নিকাহ সম্পন্ন হওয়ার জন্য তা সম্পূর্ণ যথেষ্ট হবে

ক্ববিলতু (যার অর্থ: আমি সানন্দে গ্রহণ করলাম)। রদ্বিতু (যার অর্থ: আমি এই প্রস্তাবে পুরোপুরি রাজি হলাম)তাজাওয়াজতুহা (যার অর্থ: আমি তাকে আমার স্ত্রী হিসেবে বিবাহ করলাম)। আনকাহতু নাফসি ইয়্যাহু (যার অর্থ: আমি নিজেকে তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে সঁপে দিলাম)। আজাযতুহু (যার অর্থ: আমি এই পবিত্র বন্ধন অনুমোদন করলাম)

তবে ইসলামি আইনবিদদের মতে, বিয়ের মজলিশে কেবল এই শব্দগুলো মুখে উচ্চারণ করলেই বিয়ে অলৌকিকভাবে হয়ে যাবে না। একটি নিকাহ ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ হওয়ার জন্য সমানভাবে আরও কয়েকটি স্তম্ভ নিশ্চিত করতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হলো—উভয় পক্ষের (পাত্র ও পাত্রী) কোনো প্রকার জোরজবুলদস্তি ছাড়া সম্পূর্ণ নিজস্ব ও সুস্পষ্ট সম্মতি থাকতে হবে, বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণের বাক্যগুলো সবার সামনে স্পষ্ট হতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শরিয়ত নির্ধারিত প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিস্কের নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর (দুইজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী) সশরীরে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

ইসলামি স্কলারদের চূড়ান্ত অভিমত হলো, নিকাহর ক্ষেত্রে ইসলামের মূল স্পিরিট বা আধ্যাত্মিক বিষয় হলো দুই পক্ষের মধ্যকার সুস্পষ্ট, স্বচ্ছ ও স্বাধীন সম্মতি। তাই আমাদের সমাজে ‘কবুল’ শব্দটি ঐতিহাসিকভাবে বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় হলেও, এর সমার্থক ও গ্রহণযোগ্যতা প্রকাশকারী বাংলা বা আরবি অন্য যেকোনো মার্জিত শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমেও বিয়ে ধর্মীয়ভাবে নিখুঁত ও শুদ্ধভাবে সম্পন্ন হতে পারে।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন