গরমে হিট স্ট্রোকের লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায়
লাইফস্টাইল ডেস্ক : গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে পারদ যত বাড়ছে, চিকিৎসকেরা ততই সাধারণ মানুষকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন এবং সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। অনেকেই গরমের শুরুর দিকের কিছু শারীরিক সমস্যাকে ‘সাধারণ ক্লান্তি’ বা ‘রোদের কারণে একটু দুর্বল লাগা’ ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সামান্য অবহেলাই ডেকে আনতে পারে মারাত্মক ‘হিট স্ট্রোক’। সঠিক সময়ে এর লক্ষণ চিনে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এটি জীবনঘাতী রূপ নিতে পারে।
আজ শুক্রবার (২২ মে) দুপুরে প্রকাশিত বিশেষ এক স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে হিট স্ট্রোকের লক্ষণ ও প্রতিকার নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে।
অনেকেরই ধারণা, কেবল ঘণ্টার পর ঘণ্টা সরাসরি কড়া রোদের নিচে দাঁড়িয়ে কাজ করলেই বুঝি হিট স্ট্রোক হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বদ্ধ বা অতিরিক্ত গরম ঘর, অপর্যাপ্ত বাতাস চলাচল, বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা ভ্যাপসা ভাব এবং শরীরে পানির তীব্র ঘাটতি থাকলে ঘরের ভেতরে বা ছায়ায় বসেও একজন মানুষ অনায়াসে হিট স্ট্রোকের শিকার হতে পারেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, হিট স্ট্রোক হলো তীব্র গরমজনিত এমন এক গুরুতর অবস্থা, যার ফলে শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায় এবং এটি মানুষের মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, কিডনি ও পেশিকে স্থায়ীভাবে অকেজো করে দিতে পারে। সময়মতো জরুরি চিকিৎসা না পেলে এতে মৃত্যু হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
যখন প্রচণ্ড গরমের কারণে শরীরের নিজস্ব তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Cooling System) পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ওপরে চলে যায়, তখন তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হিট স্ট্রোক বলা হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় মানবদেহ ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। কিন্তু অতিরিক্ত তাপমাত্রা বা পানিশূন্যতার কারণে যখন এই ঘাম হওয়ার প্রক্রিয়াটি বন্ধ হয়ে যায়, তখনই শরীর বিপজ্জনকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
হিট স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এর শুরুর দিকের লক্ষণগুলো খুব সাধারণ মনে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে সতর্ক হতে হবে
তীব্র মাথা ঘোরানো বা মাথা হালকা লাগা। প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা, ঝিমুনি বা অবসাদ। তীব্র মাথাব্যথা এবং বমি বমি ভাব বা সরাসরি বমি হওয়া। শরীর অতিরিক্ত গরম অনুভূত হওয়া। শুরুতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া এবং পরে হঠাৎ করে ঘাম হওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া। হৃদস্পন্দন বা পালস রেট অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া। হাত-পায়ের মাংসপেশিতে তীব্র টান বা ব্যথা (মাসল ক্র্যাম্প) হওয়া।
হিট স্ট্রোকের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে তা সরাসরি মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কে আঘাত করে। চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণে আচমকা পরিবর্তন আসা সবচেয়ে বড় বিপদের লক্ষণ। যেমন
তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি, উল্টোপাল্টা বলা বা হ্যালুসিনেশন হওয়া। যেকোনো সহজ কথার উত্তর দিতে দেরি হওয়া বা ধীর প্রতিক্রিয়া দেখানো। কথা জড়িয়ে যাওয়া বা অস্পষ্ট হওয়া। চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সাময়িক সচেতনতা হারিয়ে ফেলা। মাত্রাতিরিক্ত খিটখিটে মেজাজ, ছটফটানি বা অস্বাভাবিক আচরণ করা।
অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে বিষয়টি বোঝার আগেই তার পরিবারের সদস্যরা এই আচরণগত পরিবর্তনগুলো খেয়াল করতে পারেন। খিঁচুনি হওয়া বা জ্ঞান হারিয়ে ফেলা হলো হিট স্ট্রোকের চূড়ান্ত জরুরি অবস্থা।
গ্রীষ্মকালীন এই দাবদাহে কিছু মানুষের হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি
শিশু এবং প্রবীণ বা বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি। তীব্র রোদে কাজ করা কায়িক শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক ও মাঠের ক্রীড়াবিদ।যারা তৃষ্ণা পাওয়ার পরেও দীর্ঘক্ষণ ধরে কম পানি পান করেন। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট বা কিডনির মতো দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি। অতিরিক্ত স্থূলতা (মোটাত্ব) বা চলাফেরায় অক্ষম মানুষ।
কারো মধ্যে হিট স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে নিচের পদক্ষেপগুলো দ্রুত নিন
রোগীকে দ্রুত চড়া রোদ বা গরম পরিবেশ থেকে সরিয়ে এসি রুমে বা ফ্যানের নিচে ছায়াযুক্ত ঠান্ডা স্থানে নিয়ে আসুন।শরীরের অতিরিক্ত, ভারী বা টাইট জামাকাপড় থাকলে তা খুলে দিন বা ঢিলেঢালা করে দিন। রোগীর পুরো শরীরে ঠান্ডা পানি ছিটান বা ভেজা গামছা/তোয়ালে দিয়ে পুরো শরীর বারবার মুছে দিন। সম্ভব হলে বাথটাবে ঠান্ডা পানিতে বসিয়ে রাখুন। রোগীর ঘাড়, বগল, কপাল এবং কুঁচকিতে বরফ বা আইস প্যাক দিন। এতে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা দ্রুত নেমে আসে। রোগী যদি পুরোপুরি সজ্ঞানে ও সতর্ক থাকেন, তবেই তাকে অল্প অল্প করে খাবার স্যালাইন বা সাধারণ পানি খেতে দিন। অজ্ঞান অবস্থায় মুখে জোর করে কিছু দেওয়া যাবে না। এই প্রাথমিক চিকিৎসাগুলো দেওয়ার পাশাপাশি কালক্ষেপণ না করে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন বা রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
চিকিৎসকদের মতে, সচেতনতাই হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার সবচেয়ে সেরা ও একমাত্র উপায়
তৃষ্ণা না পেলেও সারাদিন প্রচুর পরিমাণে পানি ও স্বাস্থ্যকর তরল খাবার (যেমন: ডাবের পানি, লেবুর ঘরে তৈরি শরবত) পান করুন। দুপুরের চড়া রোদ (বিশেষ করে বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৪টা) যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন। বাইরে বের হলে হালকা রঙের, ঢিলেঢালা সুতি পোশাক পরুন এবং ছাতা, টুপি বা রোদচশমা (সানগ্লাস) ব্যবহার করুন। রোদে যেকোনো পরিশ্রমের কাজের মাঝে মাঝে ছায়ায় গিয়ে অন্তত ১০-১৫ মিনিট বিশ্রাম নিন। চা, কফি বা অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় কম খান, কারণ এগুলো শরীরকে আরও দ্রুত পানিশূন্য করে তোলে।
হিট স্ট্রোক কেবলই একটি সাধারণ ক্লান্তি বা গরম লাগা নয়; এটি একটি নীরব বৈশ্বিক ঘাতক। তাই শরীরে কোনো অস্বস্তি দেখা দিলে তা চেপে না রেখে দ্রুত ব্যবস্থা নিন এবং সুস্থ থাকুন।
জান্নাত সকালাবেলা
|