পাকিস্তানে বন্যার আবাসন সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্তে বিশ্বব্যাংকের গভীর উদ্বেগ

প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ
পাকিস্তানে বন্যার আবাসন সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্তে বিশ্বব্যাংকের গভীর উদ্বেগ
পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে বন্যাদুর্গতদের আবাসন ফান্ড বাতিলের সিদ্ধান্তে বিশ্বব্যাংকের আপত্তি

অনলাইন ডেস্ক: ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য গৃহীত টেকসই আবাসন সহায়তা কর্মসূচির অর্থ অবকাঠামো প্রকল্পে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। আন্তর্জাতিক এই অর্থায়ন সংস্থাটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, আবাসন সহায়তা থেকে উপযুক্ত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে বাদ দিলে দেশটিতে দারিদ্র্যের হার বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামলানোর সক্ষমতা চরমভাবে হ্রাস পাবে।

পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম 'ডন'-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

ইসলামাবাদের ফেডারেল কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো এক দাপ্তরিক চিঠিতে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, যাচাইকরণের পর যেসব পরিবার আবাসন সহায়তা পাওয়ার জন্য চূড়ান্তভাবে যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, হঠাৎ তাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ায় তাদের আর্থসামাজিক ভঙ্গুরতা চরম আকার ধারণ করবে। ঘরবাড়ি মেরামত ও পুনর্নির্মাণের প্রয়োজনীয় খরচ জোগাতে গিয়ে এসব পরিবার নিত্যদিনের খাবার, চিকিৎসা এবং সন্তানদের শিক্ষার মতো মৌলিক খাতের ব্যয় হ্রাস করতে বাধ্য হবে।

বিশ্বব্যাংকের সংগৃহীত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পরিকল্পিত এই আবাসন কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের ৮৪ শতাংশই মারাত্মক দরিদ্র ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। যার মধ্যে প্রায় ২৮ শতাংশ পরিবারের চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত—যাদের মাসিক আয় ৩০ মার্কিন ডলারেরও কম। পাশাপাশি ২৬ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ৩১ থেকে ৭০ ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

উপকারভোগীদের শ্রেণিবিন্যাস বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সহায়তাপ্রাপ্ত ৩৯ শতাংশ মানুষ ভূমিহীন ও ভাড়াটে, ৩৭ শতাংশ দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক এবং ৮ শতাংশ স্বল্প আয়ের ক্ষুদ্র কৃষক। অর্থাৎ, প্রকল্পটির মূল ফ্রেমওয়ার্ক সাজানো হয়েছিল এমন জনগোষ্ঠীর জন্য, যাদের কোনো স্থায়ী আয়ের নিরাপত্তা বা সংকটকালীন জমানো অর্থ নেই। ফলে হঠাৎ যেকোনো জলবায়ুজনিত বা অর্থনৈতিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা তাদের জন্য অসম্ভব।

পাকিস্তানে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর বলোরোমা আমগাবাজার সম্প্রতি দেশটির ফেডারেল পরিকল্পনামন্ত্রীসহ নীতি-নির্ধারক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে বসেন। ডনের সূত্রে জানা যায়, গৃহীত নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২২ জুন পর্যন্ত কর্মসূচির প্রথম ধাপে ৬২ হাজার ৯৬৬ জন উপকারভোগীর আবাসন সুবিধা কাটছাঁট করা হয় এবং পরবর্তীতে ভর্তুকি প্রদান ৯৭ হাজার পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। ফলে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা সত্ত্বেও ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৯টি যোগ্য পরিবার নিশ্চিত অর্থায়ন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

কর্মসূচির পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কার্যকরের টাইমিং নিয়েও জোরালো দ্বিমত পোষণ করেছে বিশ্বব্যাংক। সমন্বিত যোগাযোগ কৌশল চূড়ান্তকরণের আগেই এই নীতিগত পরিবর্তন জনসমক্ষে ঘোষণা করায় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের মনে মারাত্মক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের অফিশিয়াল অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সিস্টেমে সহায়তা বাতিল সংক্রান্ত রেকর্ডসংখ্যক ৬৬ হাজার ১২০টি অসন্তোষজনক অভিযোগ জমা পড়েছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর বাদ পড়া প্রতিটি পরিবারকে পৃথক চিঠির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত এবং সুনির্দিষ্ট কারণ স্পষ্টভাবে জানানোর জোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এসব যোগাযোগের প্রাতিষ্ঠানিক নথি বা তথ্য বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে শেয়ার করার অনুরোধ জানান তিনি। সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, সহায়তা বঞ্চিত পরিবারগুলো দারিদ্র্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের এমন এক দীর্ঘমেয়াদী ঘূর্ণাবর্তে আটকা পড়তে যাচ্ছে, যা থেকে বেরিয়ে আসতে তাদের বছরের পর বছর সংগ্রাম করতে হবে।

মন্তব্য করুন