যে নবী উম্মতের জন্য কেঁদেছেন, আমরা কি তাঁর জন্য কেঁদেছি

প্রকাশ: রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ০৫:১৮ অপরাহ্ণ
যে নবী উম্মতের জন্য কেঁদেছেন, আমরা কি তাঁর জন্য কেঁদেছি
র্ধম ডেস্ক : মানুষ পৃথিবীতে যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, নিজের অজান্তেই অবচেতন মনে তাকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করে। তার সামান্য বিচ্ছেদে মানুষের চোখ অশ্রুসজল হয়, স্মৃতির পাতায় হৃদয় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তবে মানব ইতিহাসের বুকে এমন একজন মহামানব ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল এসেছেন, যিনি তাঁর উম্মতকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। উম্মতের গুনাহ মাফ ও চিরস্থায়ী মুক্তির জন্য যিনি রাত জেগে সেজদায় পড়ে আল্লাহর দরবারে মিনতি করেছেন, তিনি আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)। বর্তমানের যান্ত্রিক জীবনে উম্মত হিসেবে আমরা সেই নবীকে কতটুকু ভালোবাসতে পেরেছি, তা নিয়ে আজ প্রতিটি মুমিনের নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।

আজ রবিবার (৭ জুন) বিকেল ৫টা ২ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ঈমান, আমল ও আত্মশুদ্ধি’ এবং ‘কুরআন-হাদিসের আলো, সীরাতে রাসুল (সা.), সাহাবায়ে কেরামের জীবন ও সুন্নাহ চর্চা মনিটরিং উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে উম্মতের জন্য নবীর কান্নার নেপথ্য খতিয়ান এবং নবীপ্রেমের আসল দাবি বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

ইসলামিক স্কলার ও মুহাদ্দিসগণের নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং হাদিসের পাতা থেকে জানা যায়, একদিন উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে অত্যন্ত প্রফুল্ল ও আনন্দিত মনে দেখে অনুরোধ করেছিলেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার জন্য আল্লাহর কাছে একটু খাস দোয়া করুন।” প্রিয়তম স্ত্রীর আবদারে নবীজী (সা.) হাত তুলে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! আপনি আয়েশার অতীতের, ভবিষ্যতের, গোপন ও প্রকাশ্য সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিন।” এই পরম সৌভাগ্যের দোয়া শুনে হযরত আয়েশা (রা.) আনন্দে আত্মহারা হয়ে হাসতে লাগলেন। তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) মুচকি হেসে বললেন, “আমার এই দোয়া কি তোমাকে আনন্দিত করেছে?” আয়েশা (রা.) উত্তর দিলেন, “এমন দোয়ায় কোন মানুষ সন্তুষ্ট না হয়ে পারে?” তখন নবীজী (সা.) একটি ঐতিহাসিক ও হৃদয়স্পর্শী বাক্য উচ্চারণ করলেন। তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম! আমি আমার উম্মতের জন্য প্রত্যেক ফরজ নামাজে এই দোয়াই করে থাকি।” অর্থাৎ আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই নবীজী আপনার ও আমার ক্ষমার জন্য প্রতি নামাজে আল্লাহর কাছে কেঁদেছেন।

সীরাতের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত রয়েছে, একদিন পথ চলতে চলতে রাসুলুল্লাহ (সা.) হুট করে কেঁদে উঠলেন। তাঁর চোখের কোণে অশ্রু দেখে সাহাবায়ে কেরাম ব্যাকুল হয়ে কান্নার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, “আমি আসলে আমার ভাইদের জন্য কাঁদছি।” সাহাবাগণ কিছুটা বিস্মিত হয়ে বললেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা কি আপনার ভাই নই?” নবীজী (সা.) পরম মমতায় উত্তর দিলেন, “তোমরা তো আমার সাহাবী (সঙ্গী)। আমার ভাই হলো তারা—যারা আমার ইন্তেকালের পর এই পৃথিবীতে আসবে এবং আমাকে একটিবারের জন্যও না দেখে আমার প্রতি পূর্ণ ঈমান আনবে।” আমরা পৃথিবীতে আসার আগেই আমাদের জন্য অশ্রু বিসর্জন দেওয়া এই দয়ালু নবীর প্রতি আমাদের ভালোবাসা আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা ভাববার বিষয়।

নবীপ্রেম কেবল মানুষের হৃদয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং জড় বস্তুও তাঁর বিরহে কেঁদেছিল। নবীজী (সা.) প্রথম জীবনে মদিনার মসজিদে একটি সাধারণ খেজুর গাছে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন। পরবর্তীতে যখন কাঠের মিম্বর তৈরি হলো এবং তিনি গাছটি ছেড়ে মিম্বরে গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন উপস্থিত সমস্ত সাহাবী সেই মৃত খেজুর গাছের ভেতর থেকে অবুঝ শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলেন। প্রিয় নবীর বিচ্ছেদে যদি একটি গাছও কাঁদতে পারে, তবে আশরাফুল মাখলুকাত হয়ে আমরা কেন পারি না?

নবীজীর ইন্তেকালের পর মদিনার বুকে আরও এক মর্মস্পর্শী ঘটনা ঘটেছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিদায়ের পর হযরত বিলাল (রা.) শোকে এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে, তিনি মদিনায় আর আজান দিতে পারতেন না। আজান দিতে গেলেই নবীর স্মৃতি তাঁকে তাড়া করত। ফলে তিনি মদিনা ছেড়ে সুদূরে চলে যান। বহু বছর পর বৃদ্ধ বয়সে তিনি যখন পুনরায় মদিনার পবিত্র মাটিতে পা রাখলেন, সাহাবিদের অনুরোধে তিনি আজান দিতে মিম্বরে দাঁড়ালেন। দীর্ঘ বছর পর বিলালের কণ্ঠে “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার” শুনে মদিনার মানুষ ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে এলেন। পুরো মদিনায় যেন নবুয়তের যুগ ফিরে এলো। কিন্তু হযরত বিলাল যখন আজানের মূল অংশ “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ” (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল) উচ্চারণ করতে গেলেন, অমনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শূন্যতার স্মৃতিতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন এবং তাঁর কান্নার আওয়াজে সেদিন পুরো মদিনা নগরী শোকে ও ক্রন্দনে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সুষ্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, “নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের থেকেও অধিক আপন।” (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ৬)। সুরা তাওবার ১২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল এসেছেন; তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক, তিনি তোমাদের পরম কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও দয়ালু।” একইভাবে সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বিশুদ্ধ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সমগ্র মানবজাতির চেয়েও অধিক প্রিয় হই।”

তাই বর্তমান যুগের ইসলামিক গবেষকদের আহ্বান—প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রতি আমাদের ভালোবাসা যেন কেবল সাময়িক সস্তা আবেগ বা স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থাকে। শেষ কবে আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথা স্মরণ করে এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেছি, শেষ কবে তাঁর ওপর মহব্বতের সাথে দরুদ পড়েছি কিংবা তাঁর একটি সুন্নাহকে নিজের পরিবারে প্রতিষ্ঠা করেছি—তা আজই মূল্যায়ন করা দরকার। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সর্বোত্তম বহিঃপ্রকাশ হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নাহর নিখুঁত অনুসরণ করা এবং বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন