দান যেভাবে জীবনে প্রশস্ততা বয়ে আনে

প্রকাশ: শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:২১ অপরাহ্ণ
দান যেভাবে জীবনে প্রশস্ততা বয়ে আনে

ইসলামী জীবন ডেস্ক : ইসলামিক জীবনব্যবস্থায় মানবকল্যাণ, ত্যাগ ও পরোপকারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো দান বা সদকা করা। পবিত্র দ্বীন ইসলামে দানশীলতাকে মুমিনের অন্যতম প্রধান ও আবশ্যিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সুন্নাহ ও হাদিসের বাণী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দান কেবল মানুষের পরকালীন জান্নাত লাভের উসিলাই নয়, বরং এটি দুনিয়াবি জীবনে মানুষের মানসিক সংকীর্ণতা দূর করে অন্তরে এক স্বর্গীয় শান্তি, রিজিকে প্রশস্ততা এবং জীবনে অলৌকিক নিরাপত্তা এনে দেয়।

আজ শুক্রবার (৫ জুন) দুপুর ২টা ৩৪ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ইসলামী জীবন’ ও ‘হাদিস রিসার্চ, আত্মশুদ্ধি, যাকাত ও সদকার ফজিলত উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে দানশীলতার উপকারিতা এবং কৃপণতার ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে বর্ণিত একটি বিখ্যাত হাদিসের বিশদ ব্যাখ্যা ও শিক্ষা আলোচনা করা হলো।

ইসলামের প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি প্রিয় নবী মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিজে মুখে বলতে শুনেছি যে, “দুনিয়াতে কৃপণ ব্যক্তি এবং দানবীর (দানশীল) ব্যক্তির দৃষ্টান্ত হলো ঠিক ওই দুই ব্যক্তির মতো, যাদের পরনে দুটি শক্ত লোহার ঢাল বা বর্ম রয়েছে। যে বর্ম দুটি পরিধানের পর শুধুমাত্র তাদের বুক থেকে গলা পর্যন্ত অংশকে আবৃত বা বিস্তৃত করে রাখে।”

আল্লাহর রাসুল (সা.) সেই রূপকের বর্ণনা দিয়ে আরও বলেন, “অতঃপর সেই দানবীর ব্যক্তি যখনই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের সম্পদ থেকে কিছু দান করে, তখনই তার পরনের সেই লোহার বর্মটি অলৌকিকভাবে প্রসারিত হয়ে তার পুরো শরীরে বিস্তৃত হয়ে যায়। সেটি এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, তা পরিশেষে তার হাতের আঙুলগুলোকেও সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলে এবং এই দানের উসিলায় দুনিয়া ও আখেরাতে তার সমস্ত গুনাহ ও ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো মাফ করে দেওয়া হয় (অর্থাৎ বর্ম যেমন মানুষকে শত্রুর আঘাত থেকে বাঁচায়, দানও তেমনি মানুষকে গুনাহ ও আজাব থেকে রক্ষা করে)।

অপরদিকে, সমাজের কৃপণ ব্যক্তি যখনই লোকলজ্জায় বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছু দান করার সামান্যতম ইচ্ছা বা সংকল্প করে, তখনই তার পরনের বর্মের প্রতিটি লোহার আংটা এসে নিজের জায়গায় শক্তভাবে আটকে যায়। ফলে সে যদি পরবর্তীতে নিজের দানের হাতকে প্রসারিত বা বড় করতেও চায়, তা ভেতরের সংকীর্ণতার কারণে আরও বেশি সংকুচিত ও ছোট হয়ে যায়। (অবশেষে মনের ভেতরের লোভের কারণে সে আর পূর্ণাঙ্গভাবে দান করতে পারে না)।” [সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ১৪৪৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৩hex (২৩৬৯) এবং মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ৭৮৮৩]।

ইসলামিক চিন্তাবিদ ও হাদিস বিশারদদের মতে, এই বরকতময় হাদিসটি থেকে মানবজীবনের আত্মশুদ্ধির জন্য ৮টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা পাওয়া যায়:

অন্তরের উদারতা বৃদ্ধি: দান মানুষের কলুষিত ও সংকীর্ণ হৃদয়কে প্রশস্ত করে। একজন দানশীল ব্যক্তি যখন খাঁটি নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করে, তখন তার অন্তর প্রাকৃতিকভাবেই অনেক উদার হয়, মন প্রশান্তিতে ভরে যায় এবং যেকোনো নেক কাজের প্রতি তার আগ্রহ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। গুনাহ মোচনের ঢাল: দান মানুষের অতীতের গুনাহ ও ভুলত্রুটি মুছে ফেলার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। হাদিসে বর্ণিত বর্ম যেভাবে মানুষের পুরো শরীরকে আবৃত করে ফেলে, ঠিক তেমনি মানুষের দান তার জীবনের সমস্ত গোপন ত্রুটি ও পাপকে আল্লাহর রহমতের চাদর দিয়ে ঢেকে দেয় এবং মহান আল্লাহ দানকারীকে ক্ষমা করে দেন। কৃপণতার মানসিক ব্যাধি: কৃপণতা মানুষের সুন্দর হৃদয়কে স্থায়ীভাবে সংকুচিত ও রোগাক্রান্ত করে ফেলে। ফলে কৃপণ ব্যক্তি নিজের ভালো বুদ্ধিতে দান করতে চাইলেও তার ভেতরের আসক্তি তাকে বাধা দেয়। সে সম্পদ কমে যাওয়ার কাল্পনিক ভয়ে দান থেকে পিছিয়ে যায়, যার ফলে তার অন্তর দিন দিন আরও বেশি কঠিন ও সংকীর্ণ পাথরের মতো হয়ে পড়ে। কল্যাণের দুয়ার উন্মোচন: দানশীল ব্যক্তি জীবনে একবার আনন্দের সাথে দান করলে, পরবর্তীতে সে আরও বড় পরিসরে দান করতে মানসিকভাবে উৎসাহিত হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর এই সৎ বান্দার জন্য দুনিয়াতে কল্যাণের সমস্ত অদৃশ্য দরজাগুলো একে একে খুলে দেন। সম্পদে প্রকৃত বরকত লাভ: মানবীয় দৃষ্টিতে দান করলে সম্পদ কমে যাচ্ছে বলে মনে হলেও, ইসলামের অমোঘ নিয়মে সম্পদের প্রকৃত বৃদ্ধি ও বরকত আসে একমাত্র দানের মাধ্যমেই। যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় দুস্থ মানুষের পেছনে ব্যয় করে, আল্লাহ তার উপার্জনে এমন বরকত দেন যা সে কখনো কল্পনাও করেনি। শয়তানের কুমন্ত্রণা প্রতিরোধ: অভিশপ্ত শয়তান সবসময় মানুষকে ভালো কাজ ও দান-সদকা থেকে বিরত রাখতে চায়। ফলে মানুষ যখনই দান করতে যায়, শয়তান তার মনে নানাবিধ অজুহাত, ভবিষ্যতের চরম দারিদ্র্যের ভয় এবং ব্যাংক ব্যালেন্স কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে। এগুলো মূলত শয়তানের মরীচিকা ও কুমন্ত্রণা, যা মুমিনদের এড়িয়ে চলতে হবে। মুমিনের আসল চাবিকাঠি: উদারতা ও পরোপকারিতা হলো একজন প্রকৃত মুমিনের অন্যতম প্রধান ভূষণ। একজন সত্যিকারের ঈমানদার মানুষ সবসময় অন্য মানুষের বিপদে উপকার করতে ভালোবাসে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের কষ্টার্জিত সম্পদ ব্যয় করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না।পরম আত্মশুদ্ধির মাধ্যম: দান হলো মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আত্মশুদ্ধির অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। কারণ নিয়মিত দান করার অভ্যাস মানুষের মন থেকে তীব্র লোভ, স্বার্থপরতা, অহংকার ও সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত অন্ধ আসক্তি দূর করে মানুষের ভেতরে খোদাভীতি বা তাকওয়া জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি করে।

পরিশেষে, মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্র কোরআন ও এই রূহানি হাদিসের ওপর যথাযথভাবে আমল করে কৃপণতার হাত থেকে বেঁচে মুক্তহস্তে আল্লাহর রাস্তায় দান করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন