খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, রাজনৈতিক বিশ্লেষক: নির্বাচনী ডামাডোলের মাঝে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নারীদের নিয়ে দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আল জাজিরায় দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স' (X)-এ প্রকাশিত (ও পরে মুছে ফেলা) একটি পোস্ট নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে তীব্র বিশ্লেষণ। প্রশ্ন উঠেছে, আধুনিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের কথা বললেও জামায়াত কি এখনো পুরোনো ও রক্ষণশীল বৃত্তেই আটকে আছে?
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, জামায়াতের শীর্ষ পদে কোনো নারী আসতে পারবেন না। এর কারণ হিসেবে তিনি ‘আল্লাহ প্রদত্ত সৃষ্টিগত ভিন্নতা’ এবং মাতৃত্বকালীন দায়িত্বের দোহাই দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন এক দেশে এই বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে যেখানে নারী নেতৃত্ব কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। মাতৃত্ব বা শারীরিক গঠন কি নেতৃত্বের পথে বাধা? এমন প্রশ্ন তোলা এখন সময়ের দাবি। জামায়াতের এই অবস্থান একদিকে যেমন নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে অস্বীকার করে, অন্যদিকে তা একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনীতির ধারার সাথেও সাংঘর্ষিক।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে আমিরের এক্স অ্যাকাউন্টের একটি পোস্ট থেকে। কর্মজীবী নারীদের নিয়ে সেখানে যে ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছিল, তা কেবল নারী অধিকার নয়, বরং সামাজিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। যদিও দলটির পক্ষ থেকে দ্রুত আইডি ‘হ্যাক’ হওয়ার দাবি করা হয়েছে, কিন্তু সচেতন মহলে সংশয় কাটেনি। হ্যাকিংয়ের এই চিরচেনা অজুহাত কি আসলে জনরোষ থেকে বাঁচার একটি বর্ম? যদি হ্যাকিং হয়েও থাকে, তবে কেন আমিরের নামেই এ ধরনের মন্তব্য পোস্ট করার সাহস পায় হ্যাকাররা—সেটি একটি বড় প্রশ্ন।
জামায়াত এখন ১১ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। জোটের অন্য দলগুলো যখন গণতন্ত্র ও সাম্যের কথা বলছে, তখন প্রধান নেতার এমন বক্তব্য জোটের ভেতরেই অস্বস্তি তৈরি করেছে। বিএনপি ও ছাত্রদল ইতিমধ্যে এই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছে। শুধু বিরোধী শিবিরই নয়, খোদ ১১ দলীয় জোটের ভেতর থেকেও এখন উঠছে প্রতিবাদের সুর। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ১০ জন নারী প্রার্থী এক যৌথ বিবৃতিতে জামায়াত আমিরের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, এই ধরনের বক্তব্য কেবল বৈষম্যই বাড়ায় না, বরং জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্নকেও ধূলিসাৎ করে। জোটের ভেতরে এমন আদর্শিক সংঘাত ভোটের মাঠে সাধারণ নারী ভোটারদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ভোটের রাজনীতিতে যেখানে নারী ভোটারদের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এমন ‘নারীবিদ্বেষী’ তকমা জামায়াতের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।জামায়াত আমির একদিকে বলছেন তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে নারীদের উচ্চশিক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে নেতৃত্বের পথ আগলে ধরছেন। এই স্ববিরোধিতা ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীরা আজ কেবল ভোটার নন, তাঁরা নীতিনির্ধারকও। আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাতে হলে নারীদের ঘরের কোণে বন্দি রাখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসাই হবে প্রকৃত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। হ্যাকিংয়ের দোহাই দিয়ে সাময়িকভাবে বিতর্ক এড়ানো গেলেও, মানুষের মনে গেঁথে যাওয়া আদর্শিক প্রশ্নগুলো কিন্তু থেকেই যাবে।