কাশ্মীরের জঙ্গলে সন্ত্রাসীদের কাছে সিমবিহীন 'ভূত নেটওয়ার্ক' লোরা প্রযুক্তি, উদ্বিগ্ন ভারত

প্রকাশ: সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ
কাশ্মীরের জঙ্গলে সন্ত্রাসীদের কাছে সিমবিহীন 'ভূত নেটওয়ার্ক' লোরা প্রযুক্তি, উদ্বিগ্ন ভারত

অনলাইন ডেস্ক: প্রচলিত মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করলে সাধারণত একটি ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা ট্র্যাকিং চিহ্ন থেকে যায়। কিন্তু সেই চেনা পথ এড়িয়ে জম্মু ও কাশ্মীরের দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গল ও নিয়ন্ত্রণরেখা (LoC) সংলগ্ন এলাকায় এনক্রিপ্টেড ‘ভূত নেটওয়ার্ক’ (Ghost Network) ব্যবহার শুরু করেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এই আধুনিক ও অভিনব যোগাযোগব্যবস্থায় কোনো প্রকার সিমকার্ড, মোবাইল টাওয়ার কিংবা ওয়াই-ফাই ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের প্রয়োজন হয় না।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানা গেছে, দুর্গম অঞ্চলে যোগাযোগের জন্য সন্ত্রাসীরা মূলত ‘লোরা’ (LoRa - Low Range) নামক স্বল্প ক্ষমতার কিন্তু দীর্ঘ দূরত্বের রেডিও প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। সম্প্রতি কাশ্মীরে নিহত ওমানি ও পাকিস্তানি শীর্ষ সন্ত্রাসী কমান্ডারদের কাছ থেকে বেশ কিছু আধুনিক এনক্রিপ্টেড ফ্রিকোয়েন্সি হ্যান্ডসেট উদ্ধারের পর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ভারতের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সন্ত্রাসীরা প্রচলিত মোবাইল কিংবা স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থার পুরোপুরি বাইরে চলে গেছে। এটি সন্ত্রাসী বার্তা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি মাত্রা।

সংবাদসূত্রে জানা যায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর কাশ্মীরের বুদগামের গুরওয়াতকালানে একটি সফল অভিযান পরিচালনা করে যৌথ বাহিনী। সেই বন্দুকযুদ্ধে লস্কর-ই-তৈয়্যেবার শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মুসা ফৌজি নিহত হয়। নিহত আসিফের মরদেহ তল্লাশি করে একটি শক্তপোক্ত কালো রঙের যন্ত্র উদ্ধার করা হয়, যার গায়ে ‘লোরা আলট্রা’ (LoRa Ultra) কথাটি খোদাই করা ছিল।

তদন্তে যুক্ত এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এনডিটিভিকে বলেন, "এগুলো সাধারণ কোনো ওয়াকিটকি নয়। এগুলো বিশেষ প্রযুক্তিতে এনক্রিপ্ট করা রেডিও ট্রান্সমিটার। এগুলো একটি অন্যটির সংকেত রিলে (Relay) করে আরও দূরে পৌঁছে দিতে পারে। এতে নেটওয়ার্ক বা সিমের প্রয়োজন নেই, ফলে সাধারণ মোবাইল নজরদারিতে এর কোনো ডিজিটাল সিগন্যাল বা লোকেশন ধরা পড়ে না।"

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, লোরা প্রযুক্তির সাহায্যে ঘন জঙ্গল ও উঁচু পাহাড়ের মধ্য থেকেও কিলোমিটারের পর কিলোমিটার ছোট বার্তা (Text Messages), সরাসরি জিপিএস লোকেশন এবং জরুরি বিপদসংকেত পাঠানো যায়। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো— এটি 'মেশ নেটওয়ার্ক' গঠন করতে পারে। অর্থাৎ, মধ্যবর্তী একটি ডিভাইস অন্য ডিভাইসের সিগন্যালকে রিসিভ করে নিজে থেকেই বহুদূরে তা ফরোয়ার্ড বা পুনর্প্রেরণ করতে পারে। ফলে দুর্গম পাহাড়ের ভেতরে থাকা ডিভাইস ব্যবহার করে সরাসরি নিয়ন্ত্রণরেখার ওপারে বা পাকিস্তানে বসে থাকা হ্যান্ডলার বা নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা সম্ভব।

এর আগে দাচ্চিগাম ও পহেলগামের মধ্যবর্তী দুর্গম অঞ্চলে 'অপারেশন মহাদেব' চলার সময়ও একাধিক এনক্রিপ্টেড লোরা যন্ত্র এবং সিমবিহীন একবার ব্যবহারযোগ্য (Disposables) ফোন উদ্ধার করা হয়েছিল।

ভারতের জাতীয় প্রযুক্তিগত গবেষণা সংস্থা (NTRO) উদ্ধৃত ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক বিশ্লেষণ শুরু করেছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই ডিভাইসগুলো স্থানীয়ভাবে তৈরি নয়। এগুলো বিশেষ কোনো স্থান থেকে আগে থেকেই এনক্রিপ্ট ও ফ্রিকোয়েন্সি সেট করে সীমান্ত পারের সন্ত্রাসীদের জন্য পাঠানো হয়েছিল।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেদের ট্র্যাকিং ও নজরদারি কৌশলে দ্রুত পরিবর্তন আনছে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও স্থানীয় পুলিশ। দক্ষিণ কাশ্মীরের বিভিন্ন জঙ্গল ও কৌশলগত পাহাড়ে লোরা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি শনাক্ত করতে সক্ষম— এমন আধুনিক ডিটেক্টর ও রেডিও স্পেকট্রাম স্ক্যানার বসানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গোয়েন্দারা জানান, এখন শুধুই সিমকার্ড মোবাইল ট্র্যাকিং নয়, সিমবিহীন এই রহস্যময় রেডিও সিগন্যাল খুঁজে বের করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য।