সৌদির তেল রপ্তানিতে হুথি ঝুঁকি: ইসরায়েল-ইরানের গোপন পাইপলাইন কি নতুন ভরসা?
অনলাইন ডেস্ক: ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের অব্যাহত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যবস্থা। রিয়াদের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি নেটওয়ার্কের এই বড় ধরনের কৌশলগত দুর্বলতা এখন দেশটির উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের প্রধান মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি সৌদি আরামকোর জাজান ও ইয়ানবু স্থাপনায় হুথিদের হামলায় দৈনিক চার লাখ ব্যারেল সক্ষমতার জাজান শোধনাগার সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করতে হয়। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং হরমুজ প্রণালি—উভয় নৌপথেই তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউরোপে অপরিশোধিত তেল পাঠানোর খরচ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনও পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে না পারায় এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকদের নজরে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গোপন ও কৌশলগত একটি প্রকল্প—ইসরায়েলের 'ইউরোপ এশিয়া পাইপলাইন কম্পানি' (ইএপিসি)-এর ২৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ গোপন ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন।
১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে ইসরায়েল এবং তৎকালীন ইরানের শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির যৌথ উদ্যোগে গোপনে এই পাইপলাইনটি নির্মিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, লোহিত সাগরের এলাত বন্দরে পৌঁছানো ইরানের তেল সুয়েজ খাল এড়িয়ে ইসরায়েলের ভূখণ্ড দিয়ে আশকেলন বন্দরে নিয়ে যাওয়া এবং সেখান থেকে ছোট জাহাজে ইউরোপে রপ্তানি করা। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর তেহরানের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে গেলে পুরো অবকাঠামোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েল রাষ্ট্রায়ত্ত ঘোষণা করে।
বর্তমানে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব সমুদ্রপথ হুথিদের হুমকির মুখে থাকায় ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই প্রস্তাব দিচ্ছেন—সৌদি আরব এই ঐতিহাসিক অবকাঠামো ব্যবহার করে নিশ্চিন্তে ভূমধ্যসাগর ও ইউরোপীয় বাজারে তেল পাঠাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া ও ইসরায়েলভিত্তিক মুক্ত উৎস গোয়েন্দা বিশ্লেষক (OSINT613) জে লেটনি এ বিষয়ে এনডিটিভিকে বলেন, "চলতি জুলাই মাসের শুরুতে ইসরায়েলের শক্তি বা জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন প্রকাশ্যে ওয়াশিংটনের মাধ্যমে সৌদি আরব থেকে এলাত পর্যন্ত ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ পাইপলাইনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব মোড়।"
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সৌদি আরবের তেল পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন দিয়ে ইয়ানবুতে পৌঁছাবে। সেখান থেকে আকাবা উপসাগর হয়ে ইসরায়েলের এলাত বন্দরে তা খালাস করা হবে। এরপর উত্তরমুখী ২৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ইএপিসি পাইপলাইন দিয়ে তা ভূমধ্যসাগরের আশকেলন বন্দরে পৌঁছাবে। এই পাইপলাইনটি দিনে সর্বোচ্চ ১২ লাখ ব্যারেল তেল পরিহনে সক্ষম, যা সৌদি আরবের দৈনিক ৬০ থেকে ৭৫ লাখ ব্যারেল মোট রপ্তানির প্রায় ৫ থেকে ১৫ শতাংশ বহন করতে পারবে।
তবে প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। হুথি ও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকি ছাড়াও এলাত বন্দরের সক্ষমতা বর্তমানে আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এটি ব্যবহারযোগ্য করতে বহু বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অবশ্য অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক। রিয়াদ বরাবরই কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছে যে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ সম্ভব নয়। তবে কৌশলগত বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বৈশ্বিক তেলের বাজারের অস্থিতিশীলতা ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক মধ্যস্থতা শেষ পর্যন্ত রিয়াদকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রয়োজনে এমন অপ্রকাশ্য বাণিজ্যিক চুক্তির দিকে ধাবিত করতে পারে।
ইরান ও হুথিরা যাতে এটিকে কৌশলগত জোট হিসেবে দায়ী করতে না পারে, সেজন্য বিষয়টি এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল রাখছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। শেষ পর্যন্ত লোহিত সাগরের অস্থিরতা কত দিন দীর্ঘায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ঐতিহাসিক এই গোপন তেল পাইপলাইনের ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা।
|