জলাবদ্ধতাই মুম্বাইয়ের নিয়তি: বোম্বে হাইকোর্টের তীব্র ক্ষোভ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বর্ষা মরসুমের শুরুতেই রেকর্ডভাঙা টানা ভারী বর্ষণে রীতিমতো বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী ও বলিউড তারকাদের আবাসস্থল মুম্বাইয়ে। জলমগ্ন হয়ে পড়েছে শহরের মাইলের পর মাইল রাস্তাঘাট, বিপর্যস্ত হয়েছে লাইফলাইন খ্যাত লোকাল ট্রেন চলাচল এবং তীব্র যানজটে নাকাল আরব সাগরের পাড়ের এই অভিজাত মেগাসিটি। মুম্বাইয়ের এই চেনা কিন্তু ভয়াবহ রূপ দেখে তীব্র ক্ষোভ ও উষ্মা প্রকাশ করেছে বোম্বে হাইকোর্ট। উচ্চ আদালতের একটি ডিভিশন বেঞ্চ সাফ জানিয়েছে, বর্ষা এলেই এই চরম জলাবদ্ধতা এখন মুম্বাইয়ের অবধারিত ‘নিয়তি’তে পরিণত হয়েছে এবং এই সংকট কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং সম্পূর্ণ ‘মানবসৃষ্ট’। তাই শুধু প্রশাসন বা পৌর কর্তৃপক্ষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।
আজ বুধবার (৮ জুলাই) বোম্বে হাইকোর্টের একটি রাস্তা সম্প্রসারণ প্রকল্প সংক্রান্ত মামলার শুনানি চলাকালে মুম্বাইয়ের বর্তমান জলজট পরিস্থিতি নিয়ে এই বিস্ফোরক পর্যবেক্ষণ দেন আদালত। মামলার শুনানি করছিলেন হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগে এবং বিচারপতি গৌতম আনখাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি হাইপ্রোফাইল ডিভিশন বেঞ্চ।
শুনানিকালে বোম্বে হাইকোর্ট স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সাধারণ নাগরিকদের চরম অসচেতনতা, যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা, প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে ড্রেন আটকে রাখা, আইন অমান্য করে জমি দখলের আগ্রাসী প্রবণতা এবং পাবলিক অবকাঠামোর যথেচ্ছ অপব্যবহারের কারণেই প্রতি বছর এই কৃত্রিম বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
তীব্র অসন্তোষ ও হতাশা প্রকাশ করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগে বলেন, “নাগরিকদের দায়িত্ববোধ বলতে কিছু নেই। মানুষ প্রতিদিন বর্জ্য ফেলে শহরের মূল ড্রেনগুলো জ্যাম করে রাখছে, প্রধান রাস্তাকে পরিণত করেছে অবৈধ পার্কিংয়ের জায়গায় এবং যত্রতত্র খাবারের স্টল বসিয়ে পুরো ফুটপাত আটকে রাখছে। সাধারণ মানুষের কথা কী বলব, খোদ হাইকোর্ট ভবনের বাইরের ফুটপাতগুলোও এখন অবৈধ দোকানে দখল হয়ে আছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।”
জনগণের আইন অমান্য করার মানসিকতাকে তীব্র আক্রমণ করে প্রধান বিচারপতি আরও যোগ করেন, “আসলে আমাদের স্বভাবই হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদের মাতৃভূমিকে লুণ্ঠন করা। আমরা আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বেআইনিভাবে সরকারি জমি ও জলাশয় দখল করি, আর যখন প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদের নোটিশ আসে, কেবল তখনই নিজেদের বাঁচাতে আইনের বই খুঁজি ও আদালতের দোরগোড়ায় আসি।”
আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পর মুম্বাইয়ের পরিবেশবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদেরা সহমত পোষণ করে জানিয়েছেন, গত কয়েক দশকে মুম্বাইয়ের প্রাকৃতিক খাল ও জলাভূমিগুলো ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করার খেসারত দিচ্ছে এখন পুরো শহরবাসী। হাইকোর্টের এই কড়া বার্তার পর মুম্বাই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (BMC) অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর অ্যাকশনে যায় কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
|