ক্যানসারের টিউমার নির্মূল সম্ভব, ইনজেকশন পরীক্ষায় বড় সাফল্য

প্রকাশ: রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৪:৫৩ অপরাহ্ণ
ক্যানসারের টিউমার নির্মূল সম্ভব, ইনজেকশন পরীক্ষায় বড় সাফল্য
স্বাস্থ্য ডেস্ক : বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের ত্রাস ও মরণব্যাধি ক্যানসার নিরাময়ের গবেষণায় এবার এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। ক্যানসারে আক্রান্ত জটিল রোগীদের শরীরের ভেতরে থাকা টিউমার সম্পূর্ণ নির্মূল করতে সক্ষম একটি বিশেষ ইনজেকশন। মানবশরীরে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ সম্পন্ন করার পর চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন এক অভাবনীয় ও যুগান্তকারী সাফল্যের দাবি করেছেন চিকিৎসকেরা। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ক্যানসার রোগীদের ওপর ‘অ্যামিভান্তাম্যাব’ (Amivantamab) নামের এই আধুনিক ইনজেকশনটি পুশ করার পর মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এক-তৃতীয়াংশ রোগীর শরীরের কঠিন টিউমার অবিশ্বাস্যভাবে সংকুচিত বা ছোট হয়ে এসেছে।

আজ রবিবার (৩১ মে) বিকেল ৪টা ৪৩ মিনিটে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত এক বিশেষ বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে ক্যানসার জয়ের এই নতুন দিগন্তের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ১১টি উন্নত দেশের জটিল ক্যানসার রোগীদের ওপর এই বিশেষ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাটি সফলভাবে চালানো হয়। চিকিৎসকেরা মূলত এমন সব রোগীদের এই পরীক্ষার জন্য বেছে নিয়েছিলেন, যাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ইতিমধ্যেই ক্যানসার মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, পূর্বে অপারেশন করার পর পুনরায় টিউমার তৈরি হয়েছে কিংবা প্রচলিত আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে যাদের রোগ কোনোভাবেই নিরাময় করা সম্ভব হচ্ছিল না। এমন আশঙ্কাজনক রোগীদের শরীরে ইনজেকশনটি দেওয়ার পর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদের শারীরিক অবস্থায় এক নাটকীয় ও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। এমনকি পরীক্ষা চলাকালীনই ১৫ জন রোগীর শরীর থেকে ক্যানসারের টিউমার সম্পূর্ণ ও স্থায়ীভাবে নির্মূল হয়ে গেছে।

যুক্তরাজ্যের লন্ডনের বিখ্যাত ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ (ICR)-এর বায়োলজিক্যাল ক্যানসার থেরাপির স্বনামধন্য অধ্যাপক কেভিন হ্যারিংটন এই আবিষ্কারে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “টানা কেমোথেরাপি এবং আধুনিক ইমিউনোথেরাপির মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা নেওয়ার পরও যেসব ক্যানসার রোগীর শরীরে কোনো কাজ হচ্ছিল না, তাদের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ ইনজেকশনের এমন শক্তিশালী ও জাদুকরী কার্যকারিতা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এর আগে কখনো দেখা যায়নি।” অধ্যাপক হ্যারিংটন আরও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই নতুন ইনজেকশন থেরাপির মাধ্যমে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ক্যানসার আক্রান্ত রোগী নতুন করে জীবন ফিরে পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পাবেন।

জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ক্যানসার বিষয়ক বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সম্মেলন ‘আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’ (ASCO)-এর বার্ষিক মহাসম্মেলনে এই যুগান্তকারী গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করা হবে।

চলতি এই বিশেষ আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১০২ জন রোগী ছিলেন অত্যন্ত জটিল ‘মাথা ও ঘাড়ের’ (Head and Neck) ক্যানসারে আক্রান্ত। ইনজেকশনটি দেওয়ার পর তাদের মধ্যে ৪৩ জনের শরীরের টিউমার পুরোপুরি সংকুচিত অথবা অলৌকিকভাবে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেছে। বাকিদের মধ্যে ২৮ জনের টিউমার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ছোট হয়েছে এবং ১৫ জনের শরীর থেকে ক্যানসারের জীবাণু ও টিউমার শতভাগ নির্মূল হয়েছে।

গবেষকেরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানান, ফুসফুসের মারাত্মক ক্যানসারে (Lung Cancer) আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও এই ‘অ্যামিভান্তাম্যাব’ ইনজেকশনটি অবিশ্বাস্য ও দারুণ আশা জাগানিয়া ফলাফল দেখিয়েছে। মানবজীবন রক্ষাকারী এই অনন্য ইনজেকশনটি মূলত তৈরি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘জনসন অ্যান্ড জনসন’ (Johnson & Johnson)। বর্তমানে ক্যানসার নিরাময়ে এই ইনজেকশনের প্রায় ৬০টি ভিন্ন ভিন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও পরীক্ষা বিশ্বজুড়ে নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এই ট্রায়ালগুলো ফুসফুসের ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য করা হলেও, পাশাপাশি কলোরেক্টাল (বৃহদন্ত্র), মস্তিষ্ক (Brain Tumor) এবং পাকস্থলীর জটিল ক্যানসারের চিকিৎসায় এটি কতটা দ্রুত কাজ করে, তা-ও সমানভাবে খতিয়ে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীরা।

এই নতুন চিকিৎসায় সম্পূর্ণ সুস্থতার পথে ফিরে আসা ও সুফল পাওয়া ভাগ্যবান রোগীদেরই একজন হলেন ৫৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক কার্ল ওয়ালশ। গত ২০২৪ সালের মে মাসে তাঁর জিহ্বায় মারাত্মক ক্যানসার ধরা পড়েছিল। সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, গত বছরের জুলাই মাসে তিনি বিখ্যাত রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে ‘ওরিগ্যামি-৪’ (Origami-4) নামক বিশেষ ক্যানসার ট্রায়ালে একজন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশ নেন।

নিজের জীবনের অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে কার্ল ওয়ালশ আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “শুরুর দিকে চিকিৎসকেরা আমাকে টানা ভারী কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি দিয়েছিলেন, কিন্তু আমার জিহ্বার টিউমারে বিন্দুমাত্র কাজ হয়নি। জীবনের আশা যখন প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলাম, ঠিক তখন আমি এই ওরিগ্যামি-৪ ট্রায়ালে যোগ দিই এবং ‘অ্যামিভান্তাম্যাব’ ইনজেকশন নিতে শুরু করি। বর্তমানে আমি এই চিকিৎসার ১৭তম সাইকেলে আছি। এখন পর্যন্ত আমার শরীরের ক্যানসার যেভাবে কমে এসেছে এবং যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে আমি ও আমার পরিবার পুরোপুরি সন্তুষ্ট।”

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন