‘বনলতা এক্সপ্রেস’ বন্ধের প্রতিবাদে রুমিন ফারহানার মানববন্ধনের ডাক
আজ সোমবার (১ জুন) দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ’ ও ‘সংস্কৃতি’ বিভাগের এক বিশেষ প্রতিবেদনে সিনেমা প্রদর্শনী বন্ধের বিতর্ক এবং এর বিপরীতে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
চলচ্চিত্রের মুক্ত প্রদর্শনীতে এই মৌলবাদী বাধার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এর বিরুদ্ধে আজ সোমবার রাজপথে বড় ধরণের এক প্রতিবাদী মানববন্ধনের ডাক দিয়েছেন জাতীয় সংসদের সাবেক সদস্য এবং বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নে আজ বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে এই মানববন্ধন ও গণ-প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হবে। এই প্রতিবাদী কর্মসূচিতে তিনি নিজে সশরীরে উপস্থিত থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন বলে নিশ্চিত করেছেন।
আজ সকালে নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে রুমিন ফারহানা লেখেন, “‘বনলতা এক্সপ্রেস’ মুভি প্রদর্শনী উগ্রপন্থিদের বাধায় বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে আজ বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে একটি বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি আহ্বান করা হয়েছে। উক্ত কর্মসূচিতে মুক্তচিন্তার মানুষের পাশে উপস্থিত থাকবো আমি রুমিন ফারহানা।”
এদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃতি সন্তান ও প্রখ্যাত নির্মাতা তানিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের নির্ধারিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনী এভাবে উগ্রতার মুখে বন্ধ হয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জেলার ১০টি শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার জেলা শহরের ঐতিহ্যবাহী অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে যথাযথ আইনি অনুমতি নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে চলচ্চিত্রটির একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করার কথা ছিল। তবে শো শুরুর ঠিক আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাটির বিরুদ্ধে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের’ একটি ভিত্তিহীন ও মনগড়া অপপ্রচার ও প্রচারণা চালায় কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের একাংশ। এরপরই এক অদৃশ্য চাপে ভেন্যু কর্তৃপক্ষ তাদের দেওয়া পূর্বানুমতি আকস্মিক প্রত্যাহার করে নেয়, যার ফলে প্রদর্শনীটি মাঝপথে স্থগিত হয়ে যায়।
একই দিনে জেলার কসবা উপজেলার তালতলা গ্রামেও স্থানীয় প্রগতিশীল তরুণদের নিজস্ব উদ্যোগে এই সিনেমার আরেকটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও স্থানীয় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের হুমকি ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন হস্তক্ষেপে শেষ মুহূর্তে শো-টি বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে তীব্র অভিযোগ করা হয়েছে।
এই দুটি পৃথক ও ন্যক্কারজনক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১০টি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন আজ সকালে একটি যৌথ প্রতিবাদী বিবৃতি প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, “একটি নির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী মহল ধর্মীয় আবেগের সম্পূর্ণ ‘ভুল ব্যাখ্যা’ তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে নোংরা প্রচারণা চালায়, যার ফলে সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।”
যৌথ বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রদর্শিত হতে যাওয়া এই চলচ্চিত্রটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ‘বাংলাদেশ ফিল্ম সার্টিফিকেশন আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী যথাযথভাবে অনুমোদিত এবং সেন্সর বোর্ড কর্তৃক সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত। এটি ইতোমধ্যে দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন বড় বড় ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত ও ভূয়সী প্রশংসিত হয়েছে। এই সিনেমার আন্তর্জাতিকভাবে সফল নির্মাতা তানিম নূর স্বয়ং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটি ও মানুষের একজন কৃতি সন্তান। নিজ জন্মভূমিতেই একজন কৃতি সন্তানের সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র প্রদর্শন করতে না পারাকে চরম ‘দুঃখজনক ও লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন বিবৃতিদাতারা।
সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়ে বলেছে, চলচ্চিত্রকে একটি সমাজ পরিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যা সমাজের কঠিন বাস্তবতা, মানবিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেম সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে বড় ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে তারা দেশে সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি সব মহলকে শ্রদ্ধাশীল থাকার জোর আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে সুস্থ চলচ্চিত্রের প্রতি কিছু ধর্মান্ধ মহলের এমন ‘বৈরি ও আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি’ স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অনভিপ্রেত। তারা এই ধরণের অগণতান্ত্রিক আচরণ, সামাজিক অসহনশীলতা ও সংস্কৃতির নামে উগ্রতার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
এই যৌথ প্রতিবাদী বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ১০টি সংগঠনের মধ্যে অন্যতম হলো— ব্রাহ্মণবাড়িয়া অনুশীলন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, খেলাঘর জেলা সংসদ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী জেলা সংসদ, জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ জেলা কমিটি এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জেলা শাখাসহ মোট ১০টি প্রধান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের শীর্ষ প্রতিনিধি ও নেতারা।
জান্নাত সকালবেলা