সুড়ঙ্গ থেকে আদালত: শেষরক্ষা হলো না চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী ‘বগা’র
মোহাম্মদ সোহেল রানা (ব্যুরো চিফ, চট্টগ্রাম): দীর্ঘ নাটকীয়তা, পুলিশি অভিযান আর চট্টগ্রামজুড়ে নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আদালতের ডেরায় ধরাশায়ী হয়েছেন চট্টগ্রামের খুলশী ও পাহাড়তলী এলাকার ত্রাস, পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং কিশোর গ্যাংয়ের অন্যতম গডফাদার ওয়াকিল হোসেন ওরফে ‘বগা’।
১৮ অক্টোবর (রোববার) দুপুরে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহিদুল ইসলামের আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলেও বিচারক তা সরাসরি নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তবে এই বহুল আলোচিত গ্রেপ্তারের পর সাধারণ মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে এক বিরাট প্রশ্ন—পুলিশের খাতায় যিনি কুখ্যাত সন্ত্রাসী এবং যার বাহিনীর মহড়ার খবর প্রায়ই সংবাদপত্রের শিরোনাম হতো, তার সেই ত্রাস সৃষ্টির অস্ত্রগুলোর হদিস এখন কোথায়?
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাছে এক এক করে অধরা ও রহস্যের চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন এই বগা। গত ৪ সেপ্টেম্বর বগাকে ধরতে খুলশীর ওয়্যারলেস মোড় এলাকায় তার আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। সে সময় বগার অনুসারীরা পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়, ককটেল নিক্ষেপ করে এবং ওসিসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে গুরুতর আহত করে। সে সময় পুলিশ বগার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে একটি গোপন সুড়ঙ্গপথের সন্ধান পায়, যে সুড়ঙ্গ দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বোকা বানিয়ে সিনেমার কায়দায় উধাও হয়ে যান এই গডফাদার।
এরপর গত ৬ অক্টোবর টাইগারপাস এলাকায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ভবনে বগার অবস্থানের গুঞ্জনে চারদিকে ফের তোলপাড় শুরু হয়। ওই অভিযান ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক নাটক ও খুলশী থানার ওসির আকস্মিক বদলির ঘটনা পুরো চট্টগ্রামকে চমকে দিয়েছিল। একের পর এক এমন সব হাই-ভোল্টেজ নাটক জন্ম দিলেও শেষ পর্যন্ত পুলিশের জাল এড়াতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না; আইনি বেড়াজাল থেকে বাঁচতে শেষ পর্যন্ত আদালতে আত্মসমর্পণ করতেই হলো তাকে।
হত্যা, অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং অবৈধ জমি দখল থেকে শুরু করে বগার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ও এর আশপাশের থানায় অন্তত ২৩টি মামলা রয়েছে। বাকলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় তার বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাংয়ের হাত ধরে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
পত্রপত্রিকায় তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও কিশোর গ্যাংয়ের মহড়ার চিত্র বারবার উঠে এলেও সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো—তার বহবহর ও ক্যাডার বাহিনীর ব্যবহৃত সেই অস্ত্রগুলোর এখনো কোনো হদিস পায়নি প্রশাসন। যদিও তার কিছু সহযোগীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে, তবুও বগার নিয়ন্ত্রণাধীন অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রগুলো উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামবাসীর শঙ্কা পুরোপুরি কাটছে না। অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নেপথ্যের এই অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা না গেলে তার অনুসারীরা যেকোনো সময় ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গত বছরের ৮ জুন চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত হওয়া এই ওয়াকিল হোসেন বগার কারাবাসের খবরে পাহাড়তলী, আকবর শাহ ও খুলশী এলাকার সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বগাকে কারাগারে পাঠাতে সক্ষম হলেও, তার অপরাধ সাম্রাজ্যের শেকড় কত গভীরে এবং তার সেই অপ্রকাশিত অস্ত্রভাণ্ডার কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে—এখন সেটাই দেখার বিষয়। প্রশাসন এই অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে পুরোপুরি গ্যাংমুক্ত চট্টগ্রাম উপহার দিতে পারে কিনা, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা!
এআইএল/সকালবেলা